রহস্যময় গ্রন্থ আল-কোরআন।আল-কোরআন আরবি ভাষায় কেনো?পর্ব-০১।
নাস্তিকদের বহুআলোচিত একটি প্রশ্ন হলো : পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা থাকতে কোরআন কেনো শুধুমাত্র আরবি ভাষায় নাজিল হলো?
মাঝে মাঝে মুমিনদের মস্তিষ্কের মধ্যেও এই প্রশ্ন টারবাইনের পাখার মতো ঘুরপাক খায়।
আল্লাহ্ তায়ালা তার প্রিয় রাসূল ﷽ এর প্রতি বলেন:
আমি তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করিয়া দিয়াছি, যাহাতে উহারা উপদেশ গ্রহণ করে।(¹)
ইবনে কাসীর তার বিখ্যাত তাফসীর "তাফসীর ইবনে কাসীর" এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
আল্লাহ্ তায়ালা কোরআনুল কারীমকে খুবই সহজ,স্পষ্ট, পরিষ্কার, প্রকাশ্যমান এবং উজ্জ্বলরূপে রাসূল ﷽ এর উপর তারই ভাষায় অবতীর্ণ করেছেন, যা অত্যন্ত বাকচাতুর্থ, অলংকার এবং মাধুর্যপূর্ণ, যাতে লোকদের সহজে বোধগম্য হয়। এতদসত্ত্বেও লোকরা এটাকে অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।(²)
উপরের আয়াত ও তাফসীর উপস্থাপন করেছি মুমিনদের জন্য, যারা এরকম চিন্তায় ভোগেন যে, আল কোরআন কেনো আরবি ভাষায় নাজিল হলো।
এবার আসি নাস্তিকদের উত্তরে।
আরবি ভাষায় কোরআন নাজিলের অনেকগুলো কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো "আরবি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার শঙ্কা নেই"।
সেটা বুঝার জন্য অন্যান্য ভাষার সাথে আরবির তুলনা করা যাক।
আমাদের ভাষার কথাই বলি। বাংলা ভাষার মূল উৎস হলো স্বংস্কৃত ও তৎসম। যার দফায় দফায় রূপান্তরিত হয়ে বাংলা ভাষার উৎপত্তি। এই রূপান্তরিত হওয়ার ফলে অনেক মূল শব্দের অর্থের বদল ঘটেছে।
এখানে বলা যায় স্বংস্কৃত ভাষা প্রায় বিলুপ্ত। শুধু হিন্দু কিছু পন্ডিতগণ ছাড়া প্রায় এটি সম্পর্কে সবাই বতর্মানে অজ্ঞ।
আবার ইংরেজি ভাষার কথা যদি বলি তখনও এর বিলুপ্তগত ত্রুটি দেখা যায়। যেমন: (ইংরেজিতে Nice মানে সুন্দর। কিন্তু এই শব্দটি এসেছে লাতিন Nescius শব্দ থেকে এসেছে। কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে এটি দ্বারা বোঝানো হতো Ignorant বা মূর্খ।
আবার হিব্রু ভাষার কথা বললে, তাওরাত হিব্রু ভাষায় নাজিল হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় এটি প্রায় মৃত। তাওরাত প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে নাজিল হয়েছিল। কিন্তু হিব্রু ভাষার ডিকশনারী লিখিত হয় দশম শতাব্দীর দিকে।(³)
কিন্তু আরবি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূল ﷺ এমন এক জাতির কাছে প্রেরিত হয়েছিলেন। যারা সে সময়ে সেরা সাহিত্যপ্রিয় জাতি। তাদের ডিঙিয়ে কোনো জাতি সাহিত্যচর্চায় অগ্রগামি হতে পারেনি। ফলে আল্লাহ্ তায়ালা কোরআন নাজিল করেন উন্নত আরাবিক সাহিত্য ও ব্যাকারণের মাধ্যমে। যা দেখে তখনকার বড় মাপের সাহিত্যিকরাও আশ্চর্য হয়ে যান। আর কোরআনের হাফেজদের কল্যাণে আল্লাহর সাহায্যে তা আজও অপরিবর্তিত।
একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, আল্লাহ্ তায়ালা মূসা (আ)
কে এমন এক জাতির কাছে প্রেরণ করেন যারা ছিল যাদুপ্রিয়। ফলে আল্লাহ্ তায়ালা মূসা (আ) কে তেমনি মুজেযা দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন।
আবার ঈসা (আ) এর যুগ ছিলো চিকিৎসাবিজ্ঞানপ্রিয়। আর আল্লাহ্ তখন তাকে চিকিৎসা বিষয়ক মুজেযা দান করেন। ফলে তিনি মৃত থেকে জীবিত করতে পারতেন।
এবার দেখেন রাসূল ﷽ এর সময় আরবরা সাহিত্যপ্রিয় ছিলো। ফলে রাসূল ﷽ এর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজেযা আল কোরআন আল্লাহ্ তায়ালা উন্নত আরাবিক ব্যকারণের মাধ্যমে নাজিল করেন।
এটি কোনো সাহিত্যক বই না, আবার গীতিকবিতাও না, কোনো উপন্যাস না, কোনো বৈজ্ঞানিক বইও না। কিন্তু এতে আছে জ্বিন ও মানুষের কথা, আছে মহাকাশের কথা,আছে মানুষের হাজার বছরের অভিজ্ঞতার কথা,আছে প্রাণের সূচনা ও ভ্রুণতত্ত্বের নিবিড় সব ধারণা, আছে রাষ্ট্র, অর্থনীতি পরিচালনার উপায়, সামাজিক ও পারিবারিক শৃংখলার পদ্ধতি।
মানুষের কোনো রচনার সাথে মোটেও এর মিল নেই।
আল কোরআন আরবি ভাষায় হওয়ার আরেকটি কারণ হলো এই "ভাষার সহজলভ্যতা"।
যেমন: (আমরা বলি "তারা যাচ্ছে " এবং ইংরেজিতে They are going
এখানে সর্বনাম বা pronoun থেকে বুঝা যাচ্ছে না তারা নারী না পুরুষ। ফলে ফের প্রশ্ন উঠে তারা পুরুষ না নারী। মানে বাক্য আরো একটা বেশি যোগ করতে হবে। পক্ষান্তরে আরবিতে pronoun পরিবর্তন করলেই নারী -পুরুষ কিনা একবাক্যেই বুঝা যাবে। আরবিতে পুরুষ বুঝাতে "হুম" এবং নারী বুঝাতে "হুন্'না" ব্যবহার করলেই হবে(ছবিতে আরবি সর্বনাম দেখতে পারেন)।
ফলে একবাক্যেই বুঝা যায় নারী নাকি পুরুষ।)(⁴)
ফলে হিফ্'জ বা মুখস্ত করা অন্য ভাষার চেয়ে তুলনামূলক বেশি সহজ।
এরকম আরো নানান ফলস্রুত কারণ আছে যার জন্য আল কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল হয়েছে।
টীকাঃ
(¹)সূরা আদ দোখান, আয়াত নং: ৫৮
(²)তাফসীর ইবনে কাসীর
(³), (⁴) প্যারাডক্সিকাল সাজিদ-২
আমাদের সকল পোষ্ট তাড়াতাড়ি পেতে নিচের লিংকে গিয়ে Google News এ আমাদের সাইটটি ফলো করে রাখুন।
https://news.google.com/s/CBIww8Lwknw

