কররানী রাজবংশ (১৫৬৪-১৫৭৬) || বাংলায় মুসলিম শাসন || পর্ব- ১০ ||

 


#বাংলায়_মুসলিম_শাসন 

পর্ব নম্বর-১০ঃ

কররানী রাজবংশঃ (১৫৬৪-১৫৭৬)


শাসকদের তালিকাঃ

১. তাজ খান কররানি - ১৫৬৪-১৫৬৬,

২. সুলায়মান খান কররানি - ১৫৬৬-১৫৭২,

৩. বায়েজিদ খান কররানী - ১৫৭২,

৪. দাউদ খান কররানি - ১৫৭২-১৫৭৬।


১৫৬৪ সালে বাংলায় শুরু হয় কররাণী রাজবংশের শাসন। কররানী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজ খান কররানী। প্রকৃতপক্ষে কররানীরা আফগান বংশোদ্ভূত ছিলেন। 


তাজ খান কররানী ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। তাজ খান আফগানদের কররানী গোত্রের লোক। বিলগ্রাম বা কনৌজের যুদ্ধে তাজ খান কররানী ও তাঁর ভাই সোলায়মান কররানী শের শাহের পক্ষে অপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করে শের শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ফলে তাঁরা উভয়ে বাংলায় ও উত্তর বিহারে জায়গীর লাভ করেন। তাজ খান শের শাহের ছেলে ইসলাম শাহের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন এবং ঐ সময়ে বাংলায় বিদ্রোহ দমনে লিপ্ত হন। ঐ সময়ে সোলায়মান কররানী বিহারের গবর্নর নিযুক্ত হন। শের শাহের ছেলে ইসলাম শাহের মৃত্যুর পরে দিল্লীতে গোলযোগ দেখা দিলে তাজ খান কররানী বাংলায় চলে আসেন এবং তাঁর অন্যান্য ভাই সোলায়মান, ইমাদ ও ইলিয়াসের সঙ্গে যোগ দেন। তাজ খান প্রথমে বাংলার সুলতানের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন কিন্তু পরে সুলতানের সঙ্গে সমঝোতা করে সুলতানের অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। গিয়াস-উদ-দীন নামক এক জবরদখলকারী সূর বংশের শেষ সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসন দখল করলে তাজ খান জবরদখলকারীকে হত্যা করে গৌড়ের সিংহাসন দখল করেন। সোনারগাঁওয়ে তাঁর রাজধানী ছিল। 


তাজ খানের পর সুলায়মান খান কররানী সুলতান হন। ১৫৬৫ সালে তিনি রাজধানী গৌড় থেকে তান্ডায় নিয়ে আসেন( তান্ডার অবস্থান বর্তমান মালদা থেকে ২৪.১৪ কিমি দক্ষিণপূর্ব ও তেলিয়াগড়ি গিরিপথ থেকে ১৯.৩১ কিমি পশ্চিমে ছিল। এর বিপরীতে ছিল গৌড় এবং এই শহর গঙ্গার পশ্চিমে অবস্থিত ছিল)। সুলায়মান খান উড়িষ্যাকে স্থায়ীভাবে কররানী শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি মোগল সম্রাট আকবরের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেন। তার প্রধানমন্ত্রী লোদি খান মোগলদের উপহার সামগ্রী প্রদান করেন। কুচবিহার থেকে পুরী ও সোন নদী থেকে ব্রহ্মপুত্র নদী পর্যন্ত সুলায়মান খানের কর্তৃত্ব ছিল।


মুসলিম সুলতানদের মধ্যে সোলায়মান কররানীই সর্বপ্রথম উড়িষ্যা জয় করেন। ইতিপূর্বে অনেকেই উড়িষ্যা আক্রমণ করেন, কিন্তু জয় করতে পারেননি।


সোলায়মান কররানী একজন অত্যন্ত দক্ষ, বুদ্ধিমান এবং দূরদর্শী নরপতি ছিলেন। তাঁর উজীর লোদী খানও একজন অত্যন্ত দূরদর্শী লোক ছিলেন। তাঁদের উভয়ের চেষ্টায় বাংলায় কররানীরা সুনাম অর্জন করে। সোলায়মান কররানী বাস্তবে স্বাধীন হলেও স্বাধীন মুদ্রা জারী করেননি কিন্তু বাংলার বিভিন্ন স্থান এবং বিহার থেকে তাঁর ৫ টি শিলালিপি এই পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রায় ৭ বৎসর দক্ষতার সঙ্গে রাজত্ব করে সোলায়মান কররানী ১৫৭২ খ্রিস্টাব্দের ১১ অক্টোবর তারিখে পরলোক গমন করেন।


সোলায়মান কররানীর মৃত্যুর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র বায়েজীদ সিংহাসনে বসেন, কিন্তু তিনি হঠকারি এবং উগ্র হওয়ায় অমাত্যেরা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে এবং সোলায়মানের জামাতা হাঁসুর নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে হত্যা করে। উজীর লোদী খান আবার হাঁসুর হঠকারিতা সহ্য না করে তাঁকে হত্যা করেন এবং সোলায়মান কররানীর কনিষ্ঠ পুত্র দাউদ খান কররানীকে সিংহাসনে বসান। দাউদ খান কররানী (শাসনকাল ১৫৭২-১২ জুলাই ১৫৭৬) ছিলেন কররানী রাজবংশের এবং শাহী বাংলার সর্বশেষ সুলতান।


দাউদ খান বাংলা সালতানাত নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি শের শাহ শুরির মত উচ্চাভিলাষী ছিলেন এবং সমগ্র ভারত উপমহাদেশ জয়ের স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সম্রাট আকবরের সাথে তাঁর শত্রুতা সৃষ্টি হয়। সম্রাট আকবর গুজরাটে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকার সময় দাউদ খান গাজীপুরের কাছে জামানিয়া আক্রমণ করেন। আফগান সেনারা জামানিয়া দখল করে এর দুর্গ অধিকার করে নেয়। আকবর তার জৌনপুরের গভর্নর মুনিম খানকে দাউদ খানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন। মুনিম খান তাঁর বন্ধু দাউদ খানের প্রধানমন্ত্রী লোদি খানের সাথে পাটনায় সাক্ষাত করেন এবং শান্তি স্থাপনে সম্মত হন। তবে এই সিদ্ধান্ত আকবর বা দাউদ খান কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। পরবর্তীতে দাউদ খান লোদি খানকে শাস্তি দেন।


১৫৭৩ সালে মুনিম খান বিহার আক্রমণ করেন। ফলে দাউদ খান পিছু হটতে বাধ্য হন। তিনি পাটনায় আশ্রয় নেন। দাউদ খান কাতলু লোহানি, গুজার খান কররানী ও শ্রী হরিকে মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। মুনিম খান টোডরমল ও মানসিংকে নিয়ে হাজিপুর আক্রমণ করেন। ব্যাপক সংঘর্ষের পর আফগানরা বিজয়ী হয়। আকবর এরপর হাজিপুরের দুর্গ দখল করে নেন। এটি আফগানদের রসদ সরবরাহের উৎস ছিল। আফগানরা এর ফলে প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে এবং বাংলায় পিছু হটে। এরপর আকবর মুনিম খান কে বাংলা ও বিহারের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে ফিরে যান। তাকে সাহায্য করার জন্য টোডরমলকে রেখে যাওয়া হয়।


১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ মুঘল ও আফগানদের মধ্যে তুকারয়ের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের পর আফগানরা উড়িষ্যার কটকের দিকে পিছু হটে। মোগলরা তৎকালীন বাংলার আফগান রাজধানী তান্ডা দখল করে নেয়। মুনিম খান তান্ডা থেকে গৌড়ে রাজধানী সরিয়ে নেন। কটকের সন্ধিতে দাউদ খান বাংলা ও বিহারকে মোগলদের কাছে ছেড়ে দেন এবং নিজে উড়িষ্যায় রয়ে যান। ছয় মাস পর প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে মুনিম খান অক্টোবরে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর কালাপাহাড় ও ঈসা খান মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। দাউদ খান গৌড় পুনরায় অধিকারের জন্য উড়িষ্যা থেকে ফিরে আসেন।


আকবর এরপর খান জাহান কুলির অধীনে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি তেলিয়াগড়হি দখল করে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হন। দুই বাহিনী রাজমহলের যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হয়। যুদ্ধ অনেক দিন ধরে চলতে থাকে। বিহারের গভর্নর মোজাফফর খান তুরবাতি ও অন্যান্য সেনাপতিদের আকবর তাদের সাথে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে দাউদ খানের পাশে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আফগান নেতা, জুনায়েদ, কুতলু খান ও কালাপাহাড় ছিলেন। ভয়াবহ যুদ্ধের পর ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই ভয়াবহ যুদ্ধের পর দাউদ খান চূড়ান্তভাবে পরাজিত ও নিহত হন।


তাঁর মৃত্যুর পর বাংলা সরাসরি মুঘলদের অধীনে চলে আসে। এরপর থেকে বাংলা সুবা একজন সুবেদারের অধীনে শাসিত হতে থাকে। এইভাবে বাংলা সালতানাতের অবসান ঘটে এবং বাংলায় শুরু হয়ে যায় মুঘলদের রাজ। তবে বারো ভূইঁয়া বলে পরিচিত আফগান ও স্থানীয় জমিদাররা ঈসা খানের নেতৃত্বে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। পরবর্তীতে ১৬১২ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় বাংলা চূড়ান্তভাবে মুঘল প্রদেশে পরিণত হয়। আমরা পরবর্তী পর্বে বাংলায় মুঘলদের ইতিহাস সম্পর্কে জানবো ইনশাআল্লাহ।


তথ্যসূত্রঃ


১. বাংলার ইতিহাস, মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিপ্লব পর্যন্ত [১২০০-১৮৫৭ খ্রিঃ], আব্দুল করিম।

২. Eaton, Richard (১৯৯৬)। The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760। University of California Press। পৃষ্ঠা 140।

৩. Sengupta, Nitish (২০১১)। Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib। Penguin Books India। পৃষ্ঠা 126।

৪. Hasan, Perween (২০০৭)। Sultans and Mosques: The Early Muslim Architecture of Bangladesh। I.B.Tauris। পৃষ্ঠা 18।

৫. দাউদ খান কররানী, বাংলাপিডিয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন