মাত্রাকচি নাসুহ আল-সিলাহিঃ অসামান্য প্রতিভাধর এক উসমানীয় সমরনায়ক

Matrakci Nasuh Effendi

Matrakci Nasuh Effendi 

পৃথিবীর ইতিহাসের বিভিন্ন রাষ্ট্রে যারা তাদের জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞার দ্বারা রাষ্ট্র ও মানবজাতির কল্যাণের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদেরই একজন উসমানীয় সালতানাতের উজ্জ্বল নক্ষত্র মাত্রাকচি নাসুহ এফেন্দী। তাঁর পুরো নাম -- নাসুহ বিন কারাগোজ বিন আবদুল্লাহ আল-ভিসোকাভি আল-বসনাভি। তিনি ছিলেন একেধারে উসমানীয় সালতানাতের একজন বিখ্যাত গণিতবিদ, মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যাবিশারদ, বহুবিদ্যাবিশারদ (পলিম্যাথ), ইতিহাসবিদ, ভূগোলবিদ, কূটনীতিবিদ, অনুচিত্রশিল্পী, জ্যামিতিবিশারদ, রাজনীতিবিদ, অসিবিদ্যাবিশারদ, অস্ত্রবিশারদ শিক্ষক ও আবিষ্কারক। তিনি 'মাত্রাক' নামক খেলা উদ্ভাবনের কারণে মাত্রাকচি হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। তিনি ১৪৮০ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বসনিয়া সানজাকের ভিসোকোয় জন্মগ্রহণ করেন। একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করার পরও তিনি 'ডেভসিরমে' পদ্ধতিতে ইস্তাম্বুলে আসেন এবং তুখোড় মেধাবী, দক্ষ তীরন্দাজ ও অসিচালক হওয়ার কারণে জনপ্রিয়তা পান এবং এন্দুরান ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হন। 

নাসুহ এফেন্দী অঙ্কিত 'সুলতানিয়েহ' শহরের মানচিত্র

 নাসুহ এফেন্দী অঙ্কিত 'সুলতানিয়েহ' শহরের মানচিত্র 


এন্দুরান ইউনিভার্সিটি ছিলো ততকালীন সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সবচাইতে সমৃদ্ধ ও বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ।শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সবচাইতে বেশি মেধার স্বাক্ষর রাখতো, তারাই কেবল এন্দুরানে পড়াশোনা করার সুযোগ পেতো। এছাড়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাহজাদা রা এন্দুরান থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করতেন। উসমানীয় সালতানাতে প্রায় সকল শিক্ষার্থীর জন্যই শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতো। আর যারা শিক্ষিত হতে পারতেন তাঁদেরকে কখনো বেকার থাকতে হতো না। পেশা গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ থাকতো শিক্ষকতা। কাজী হিসেবে যোগদানের চাইতে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করাটাই বেশি পছন্দনীয় হতো। উসমানীয় সালতানাতে মাদ্রাসার একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে একজন গ্র‍্যাজুয়েট যোগদান করলেও ধীরে ধীরে যোগ্যতার ভিত্তিতে দ্রুতই পদোন্নতি ঘটতো, সবচাইতে বেশি মেধাবী শিক্ষকেরা এন্দুরান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হিসেবে যোগদানের সুযোগ পেতেন। এন্দুরান থেকেই বের হয়ে আসতো ওলামা, মাশায়েখ, শিক্ষক, ইমাম, বড় বড় ইসলামিক স্কলার.......... অন্যদিকে কাজী হিসেবে পেশায় যোগদানের ক্ষেত্রে বেতন শিক্ষকতার চাইতে তুলনামূলক কিছুটা বেশি হলেও পদোন্নতি হতো ধীরগতিতে। এন্দুরান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সালতানাত পরিচালনায় দক্ষ হতেন, তাদের সানজাক বে হিসেবে নিয়োগ করা হতো এবং সানজাক বে বা প্রাদেশিক গভর্নর থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে তারা পাশা হতেন। আনাতোলিয়া,রুমেলি, মিশর, বাগদাদ ইত্যাদি বৃহত্তর প্রদেশগুলো শাসন করতেন একজন বেইলারবে বা গভর্নর জেনারেল। অর্থাত, গ্রেটার প্রোভিন্সের অন্তর্ভুক্ত সকল সানজাক বে দের প্রধান। বেইলারবে নিয়োগের পূর্বে উজিরে আজম কে অবশ্যই সুলতান কে বিষয়টি অবগত করতে হতো। এন্দুরানের যে সব শিক্ষার্থীরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হতেন তাদের কে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।তারা চলে যেতো জেনিচেরী বাহিনীতে এবং জেনিচেরী বাহিনীর একজন সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর ধীরে ধীরে পদোন্নতির মাধ্যমে তারা সানজাক বে বা পাশা হতে পারতেন। আর এন্দুরানের যেসব গ্র‍্যাজুয়েট একই সাথে যুদ্ধবিদ্যা ও সালতানাত পরিচালনায় দক্ষ হতেন, তারা সুলতানের বিশেষ নজরে থাকতেন। তাদেরকে দেওয়া হতো সুলতানের বিভিন্ন দায়িত্ব, যেমন - শাহী আস্তাবলের প্রধান রক্ষক, সুলতানের প্রধান দ্বাররক্ষী, সুলতানের বাজপাখি রক্ষক, সুলতানের প্রধান শরবত পানি পরিবেশক, সুলতানের শিকারি কুকুরের প্রধান প্রশিক্ষক। আপাতদৃষ্টিতে এসব কাজ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও তারা সুলতানের সঙ্গে সবসময় থেকে সালতানাত পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করতেন। পরবর্তীতে তাদের মধ্য থেকে পাশা নিয়োগ করা হতো। এভাবেই এক দক্ষ ক্যাডারভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন ফাতিহ সুলতান মেহমেদ খান। 

'মুহতেশিম ইয়ুজিল' (সুলতান সুলেমান) সিরিজে মাত্রাকচি নাসুহ আল-সিলাহি

'মুহতেশিম ইয়ুজিল' (সুলতান সুলেমান) সিরিজে মাত্রাকচি নাসুহ আল-সিলাহি


মাত্রাকচি নাসুহ এন্দুরান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন এবং কিছুকাল তিনি অটোমান নৌবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি এন্দুরান ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষক হিসেবে  যোগদান করেন। তিনি গণিতবিদ্যা,ভূগোল, জ্যামিতি, মানচিত্রে ব্যাপক পারদর্শী ছিলেন। দীর্ঘদিন গণিতশাস্ত্র ও জ্যামিতি নিয়ে পড়াশোনা করার পর তিনি গণিতশাস্ত্রের উপর "কেমালুল হিসাব'' ও "কেমালুল খুত্তাব" নামে দুইটি গ্রন্থ রচনা করেন ও ইয়াভূজ সুলতান সেলিম খানের নিকটে পেশ করেন। তিনি বেশ কয়েকজন সুলতানের অধীনে কাজ করেছেন। সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির ১৫২০ সাল থেকে শুরু করে ১৫৪৩ সাল পর্যন্ত শাসন কালের ইতিহাস নিয়ে তিনি 'মেকমুত তেভারিজ' ও 'সুলাইমাননামা' নামে দুইটি ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। সুলতান সুলাইমানের সাফাভিদ অভিযানের উপর ভিত্তি করে মাত্রাকচি নাসুহ এফেন্দী  "বেয়ান ই-মেনজিন-ই-সাফার-ই-ইন্সেন-যুলত" রচনা করেন এবং অটোমানদের মলদোভা বিজয়কে কেন্দ্র করে তিনি "ফেতিহানামা-ই-কারাবুগদান" রচনা করেন।


মাত্রাকচি নাসুহ একজন দক্ষ সৈনিক ও অসিচালক ছিলেন এবং অসিচালনায় পারদর্শিতার জন্য তিনি 'নাসুহ আল-সিলাহি' (তলোয়ার মানব নাসুহ) হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি এন্দুরান ইউনিভার্সিটিতে অসিবিদ্যাপ্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন অস্ত্রের সুষ্ঠু ব্যবহারবিধি তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর "তুহফেত-উল-গুজাত" (Gift of warriors) গ্রন্থে। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি অনুচিত্রকর্মে ব্যাপক পারদর্শী ছিলেন। তিনি তাঁর রচনায় সুলতানদের এবং ইতিহাসের বিভিন্ন প্রামাণ্য অনুচিত্রকর্ম অত্যন্ত চমতকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি মানচিত্রাঙ্কন ও মানচিত্র বিশ্লেষণে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর সবচাইতে বিখ্যাত অনুচিত্রটি ইস্তানবুলের উপর ভিত্তি করে অঙ্কিত হয়েছে। মাত্রাকচির অঙ্কিত বিভিন্ন শহরের নিখুঁত মানচিত্রসমূহ দেখে অবাক হতে হয়।


তাঁর "উমদেত-উল-হিসাব" গ্রন্থ  প র্যা লো চনা করলে দেখা যায়, জন নেপিয়ার ইউরোপে গণিতশাস্ত্রের বিশেষ হিসাব পদ্ধতি 'ল্যাটিস মেথড' আবিষ্কারের প্রায় ৫০ বছর আগেই নাসুহ এফেন্দী এন্দুরানে এই পদ্ধতির সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য সুলতান সুলেইমান কর্তৃক তিনি "উস্তাদ"('master') ও "রেইস"('chief') উপাধিতে সম্মানিত হন। মাত্রাকচি নাসুহ এফেন্দীকে তাঁর বহুমুখী পাণ্ডিত্যের জন্য বসনিয়ার 'লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি' বলা হয়। 


১৫৬৪ সালে এই মহান পণ্ডিত ইস্তানবুলে ইন্তেকাল করেন।


আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন ❤️❤️


✍️✍️ লেখাঃ- রাজিত তাহমীদ জিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন