আমির তাইমুর গুরিগান--এশিয়ার সর্বশেষ দ্বিগ্বিজয়ী [পর্ব-১]

আমির তাইমুর গুরিগান--এশিয়ার সর্বশেষ দ্বিগ্বিজয়ী
-------------------------------

(একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা)
পর্ব-১


১৩৩৬ সালের ৯ এপ্রিল,উজবেকিস্তানের শাহরিবাজে এক ঘরে জন্ম হয় একটি শিশুর।তার পিতার নাম তারাঘাই,বারলাস নামক একটি গোত্রে তাদের বসবাস।তারা তাতার জাতি হলেও মুসলিম ছিলেন,তারাঘাইয়ের পরদাদা কারাজাই সর্বপ্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।তখন থেকেই ধর্ম-কর্ম পালন করে আসছে তারাঘাইয়ের পরিবার।ছেলের নাম রাখলেন,তাইমুর।
ইনি-ই বিশ্বখ্যাত তাইমুর 'লঙ'।কিশোর বয়সে তীরের আঘাতে খোঁড়া পায়ের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছিল তাইমুরের,কালক্রমে সেটাই তার নামের সাথে যোগ হয়ে যায়।'লঙ' মানে খোঁড়া।

তাইমুর ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ,পিতা সবসময় তাকে আদেশ দিতেন ধর্মের উপর চলার জন্য। আলেম-উলামার শুভদৃষ্টি আর বারাকাহ হাসিলের জন্য।তাইমুর সে আদেশ পালন করতেন নিয়মিত,আলেম-উলামার সোহবতে থেকে নিজেকে ধন্য করতেন।

তাইমুর ক্ষমতায় আরোহনের স্বপ্ন দেখেছিলেন।তাই সমরখন্দ আসা,এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৩৭০ সালে সমরখন্দের সিংহাসনে বসার সৌভাগ্য হলো তার।তাইমুরের যোগ্যতা,বিচক্ষণতা,উপস্থিত বুদ্ধির তুলনা ছিলো না,তাই সিংহাসন ছিলো তার নিজের অর্জন।বিশিষ্ট ফকিহ মোল্লা যায়নুদ্দিন রহিমাহুল্লাহু পবিত্র কোরআ'ন হাতে নিয়ে তাকে শপথ করান।
দেখুন,"হাকিকাতু তাইমুর লঙ আল আযিম"(প্রথম খন্ড -পৃষ্ঠা ১৫৯)

কিন্তু,হঠাৎ করেই এই মানুষটা কিভাবে ইতিহাসের দ্বিতীয় চেঙ্গিস খান হিসেবে আবির্ভূত হলেন।কিভাবে এক কোটি সত্তুর লাখ মানুষের হন্তারক হয়ে গেলেন।এগুলো কি অপবাদ,নাকি বাস্তবতা??

আমি সীমিত জ্ঞান ও অল্প পরিসরে আমির তাইমুর সম্পর্কে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করবো,ইন-শা-আল্লাহ।

১--তাইমুরের যুদ্ধক্ষেত্রঃ------
তাইমুর সম্পর্কে পর্যালোচনা করার পূর্বে আমাদের কে তাইমুরের যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।তাইমুর ছিলেন মা-উরাউন নাহার অঞ্চলের অধিবাসী।আধুনিক পরিভাষায় একে বলা হয় ট্রান্সঅক্সিয়ানা।আধুনিক উজবেকিস্থান, তাজিকিস্তান,কিরগিজস্থান,কাজাখস্তান নিয়ে  ট্রান্সঅক্সিয়ানা গঠিত হয়েছে।ট্রান্সঅক্সিয়ানার উত্তর ও দক্ষিণ দিয়ে বয়ে গেছে 'নাহরে 'সায়হুন' (আমু দরিয়া)ও 'জায়হুন' (সির দরিয়া)।প্রাচ্যের রোম খ্যাত সমরখন্দ উজবেকিস্তানের-ই শহর।১৩৭০ সালে সমরখন্দের সিংহাসনে বসে তাইমুর গুরিগান কার্যত পুরো ট্রান্সঅক্সিয়ানার বাদশাহ বনে যান।১৩৭০ থেকে ১৪০৫ পর্যন্ত দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছরের সামরিক জীবনে তাইমুর জয় করেছেন খোয়ারিজম,খোরাসান,ইরাক,ইরান,আজারবাইজান, দিয়ারবাকির,সিস্থান,কুর্দিস্তান,হিন্দুস্থান (ভারত),রাশিয়া ও আনাতোলিয়া।তাইমুর ইউরোপে প্রবেশ করেছিলেন রাশিয়া মধ্য দিয়ে।তবে বেশিদূর তিনি যাননি।এশিয়াতে-ই পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন। একটি বিষয় লক্ষ্য করুন,রাশিয়া ছাড়া তাইমুরের পুরো যুদ্ধক্ষেত্র ছিলো এশিয়া,যার সিংহভাগ অধিবাসী ছিলো মুসলিম।যার শাসকরা ছিলো মুসলিম।একইভাবে রাশিয়ার মোঙ্গল সাম্রাজ্য গোল্ডেন হোর্ডের অধিপতি তুকতামিশ খানও ছিলেন মুসলিম।ক্ষমতার লড়াইয়ে যিনি ছিলেন তাইমুরের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী।

তাইমুর যেহেতু মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার সত্তর শতাংশ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন,তাই মুসলিম হত্যা অনেকেই মেনে নিতে পারেন নি।তাইমুর সম্পর্কে বহু বই লেখা হয়েছে,কারো কাছে তিনি বিখ্যাত আর কেউ তাকে চিত্রিত করেছে কুখ্যাত হিসেবে।এ ধরণের লেখা যেমন তাইমুরের সমসাময়িক লেখক লিখেছেন,ঠিক আটশো বছর পরের লেখকও তাইমুরকে বিতর্কিত করেছেন।হয়তো তাইমুর একমাত্র ব্যক্তি যিনি একইসাথে ভালোবাসা আর ঘৃণা দু’টোই পেয়েছেন।

আহমাদ ইবনে আরব'শাহঃ-
আহমাদ ইবনে আরব'শাহ র জন্ম ১৩৮৯ সালে।তাইমুরের জীবনী নিয়ে তিনি লিখেন,'عجاءب المقدور في نواءب تيمور' এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন,-জে.এস.সেন্ডারস "Timerlane or Timur,The great Amir"।এই বইয়ে আহমাদ ইবনে আরব'শাহ তাইমুর সম্পর্কে যে ঘৃণা আর বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর।বাগদাদ আর দামেস্কে তাইমুরের নৃশংসতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।বাগদাদ ও দামেস্কে লাখো মানুষ হত্যা করে মাথার খুলির টাওয়ার বা পিরামিড বানানো,রক্তে টাইগ্রিস নদী লাল হওয়ার বর্ননাও দিয়েছেন আহমাদ ইবনে আরব-শাহ।
যেমন তিনি লিখেছেনঃThen he
ordered each of those who were enrolled in his register and reckoned among his soldiers and army to bring to him two
heads from among the people of Bagdad. Accordingly they gave each of them to drink the wine of plundered life and
plundered wealth, two cups. Then they brought them singly and in crowds and made the river Tigris flow with the torrent
of their blood throwing their corpses on to the plains, and collected their heads and built towers of them. (Page:168)

তাইমুরের সমকালীন লেখকদের মধ্যে আছেন ১৩৭০ সালে পারস্যে জন্মগ্রহণ করা শেরিফ আদ দিন আল ইয়াজদি যিনি তাতারদের সাথে কয়েকটি যুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন।তাইমুরের জীবনীর উপর তার বই 'জাফরনামা'যা তিনি তাইমুরের পুত্র শাহরুখের পৃষ্ঠপোষকতায় লিখেছিলেন।একইভাবে নিজাম-ই শাম,মুহাম্মাদ ইবনে ফজলুল্লাহ মুসাভি।তারা সকলে তাইমুরের সমকালীন ছিলেন এবং কোন না কোনভাবে তাইমুরের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন কিংবা তাইমুরের সভায় ছিলেন। দেখুন;দুনিয়া কাপানো তৈমুর লঙ ---হ্যারল্ড ল্যাম্ব। বাংলা অনুবাদ, যায়নুদ্দিন সানী।(পৃষ্ঠাঃ২৩০-২৩১)

তাইমুরের জীবনী নিয়ে যারা কাজ করেছেন,তারা সকলে আহমাদ ইবনে আরব-শাহ ও বাকি তিনজনের লেখার উপর ভিত্তি করে তাদের বই লিখেছেন।এক্ষেত্রে আহমাদ ইবনে আরব-শাহর প্রাধান্য বেশ,বেশিরভাগ লেখক-ই তার লেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন ও নিজেদের বইয়ে এ বইয়ের তথ্যসূত্র যোগ করেছেন।
যেমন,ব্রিটিশ সাংবাদিক Justin Marozzi (1970-Present)লিখেছেন “Timerlane:Sword of Islam,Conquer of the World (2004)“।পুরো বইয়ে তিনি বারবার ইবনে আরব-শাহর রেফারেন্স টেনেছেন।বাগদাদ,দামেস্কের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আরব-শাহর উক্তিগুলো উল্লেখ করেছেন বরাবর-ই।

যেমন তার বইয়ের ২৩৮ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেনঃ  As he prayed, his soldiers were putting the finishing touches to the 120
towers of skulls they had erected around the flattened city. What Arabshah
termed the ‘pilgrimage of destruction’ was almost at an end. Antioch and Acre,
Baalbek and Beirut, Hama and Homs, all lay in ruins. Damascus had been torn
apart and gutted. In Aleppo, twenty thousand heads had been severed. In
Baghdad the atrocities had reached new heights. This time the vultures had
ninety thousand to feed on.

তিনি তার বইয়ের অষ্টম অধ্যায়টির নাম-ই রেখেছেন pilgrimage of destruction’ বা "ধ্বংসের তীর্থযাত্রা"!

একইভাবে,১৯৫৫ সালে কায়রোতে জন্মগ্রহণ করা মনসুর আব্দুল হাকিম লিখেছেন,“امبراطور على صهوة جواد - سفاك الدماء وهادم الحضارات“যার অর্থ,”ঘোড়ার পিঠে সম্রাটঃরক্তপাতকারী আর সভ্যতার হন্তারক।এই বইয়ের ভূমিকায় লেখক বলেন,তাতার আর মোঙ্গল রা ইসলাম গ্রহন করলেও রক্ত আর লুটতরাজের নেশা তারা পরিত্যাগ করেনি।লেখক তার বইয়ে বাগদাদ,সিরিয়া আর ভারতের লাখ লাখ মানুষ হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন।যার জন্য সরাসরি তাইমুর ও তার তাতার বাহিনী কে দায়ী করেছেন।তাইমুর কে তিনি চেঙ্গিস খান ও হালাকু খানের চেয়ে মোটেও ভিন্ন চোখে দেখেননি।

প্রিয় পাঠক!এভাবে কিছু ঐতিহাসিক তাইমুর গুরিগান কে নিয়ে বিষোদগার করতেছেন,তবে এর সত্যতা কতটুকু?অন্য লেখকরা তাদের লেখা, বিশেষত আহমাদ ইবনে আরব-শাহ সম্পর্কে অন্য লেখকদের কি মতামত, সে সম্পর্কে থাকছে আগামী পর্বে।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন