কিছু কথা-------
সকল প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামিনের জন্য যিনি এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি, যিনি আমাকে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন।
লক্ষ - কোটি দুরুদ ও সালাম এই জাহানের মায়ময় নবী মানবজাতির রাসূল মুহাম্মদ (সঃ) জন্য, যার উম্মত হতে পেরে নগণ্য আমি গর্বিত হতে পেরেছি। অযুত নিযুত রহমত নাজিল হোক সাহাবায়ে কিরামের প্রতি যারা রাসূলের আদর্শ মনে প্রাণে ধারণ করেছেন।
সৃষ্টির শুরু থেকেই সত্য মিথ্যার লড়াই শুরু হয়েছে। তেমনি ভাবে আব্বাসীয় খেলাফতের যুগে শিয়া-ফাতেমিরা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলো মিথ্যার ফাদ। তাদের ভ্রান্ত আকিদা ও ফেতনা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে সহিহ আকিদা থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার খেলায় তারা মেতে উঠেছিলো।
কিন্তু আল্লাহ সুবহানা তায়া’লা কুরআনে বলেছেন--- وَ قُلۡ جَآءَ الۡحَقُّ وَ زَہَقَ الۡبَاطِلُ ؕ اِنَّ الۡبَاطِلَ کَانَ زَہُوۡقًا ﴿۸۱﴾
আর বলঃ সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; মিথ্যাতো বিলুপ্ত হয়েই থাকে।
ঠিক সেভাবেই আল্লাহ তায়ালা এ মিথ্যা দূরীকরণে উছিলা হিসেবে সেলজুক প্রধানমন্ত্রী নিজামুল মুলক দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজামুল মুলক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদারিসে নিজামিয়া এ ভ্রান্তি দূর করতে বিভিন্ন কার্যক্রম করে। এই মাদারিসে নিজামিয়া সম্পর্কেই কিছু কথা লিখতে চলেছি। এই লেখায় যা কিছু সত্যি তা করুণাময় আল্লাহর কৃপায় এবং যা কিছু অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা তা আমার সল্পতার জন্য এবং এর জন্য আমি অগ্রীম ক্ষমাপ্রার্থী।
ভূমিকা ---------
নিজামিয়া হলো উচ্চ শিক্ষার জন্য মধ্যযুগের এক প্রকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি যা নিজামুল মুলক কর্তৃক সূচিত হয়। " নিজামিয়া "তার নাম (নিজামুল মুলক) থেকে সৃষ্ট। [১] মাদারিসে নিজামিয়া সম্পর্কে জানার আগে আমরা মাদরাসার উৎপত্তি, মাদারিসে নিজামিয়া প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বের অবস্থা সম্পর্কে জানবো ইন শা আল্লাহ।
মাদরাসার উৎপত্তি --------
মাদারাসা শব্দটি আরবি শব্দ দারসুন থেকে আগত যার অর্থ পাঠ করা। মাদরাসা শব্দটির বহুবচন মাদারিস, এর অর্থ অনেকগুলো মাদ্রাসাকে একত্রে বোঝানো হয়। মাদরাসা মূলত মুসলমানদের অধ্যয়ন-গবেষণা প্রতিষ্ঠান। [২]
অবকাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামি প্রতিষ্ঠান বা মাদরাসার উৎপত্তির সূচনাকাল নিয়ে ঐতিহাসিক এবং শিক্ষাবিদদের রয়েছে বিভিন্ন মতভেদ। কারও কারও মতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়েছে ৪৫৯ হিজরিতে নিজামুল মুলকের শাসনামলে " মাদরাসায়ে নিজামিয়া " প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। [৩]
আবার অনেকে বলেছেন, মাদরাসার উৎপত্তি ঘটেছে অনেক আগে। নির্ভরযোগ্য বইপুস্তক ঘাঁটলে দেখা যায়, সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাদরাসার উৎপত্তি হয়েঋে হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে এবং তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে। আর এ সময়ের প্রথম মাদরাসা ছিলো "ইমাম ফকিহ আবু হাফস আল-বুখারি (১৫০হি. - ২১৭হি.) মাদরাসা "। প্রতিষ্ঠাতার দিকে সমন্ধযুক্ত হওয়া থেকে প্রতীয়মান হয়, প্রতিষ্ঠানটি তার জীবৎকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। [৪]
মাদারিসে নিজামিয়া প্রতিষ্ঠার পূর্বাবস্থা-----------------
সেলজুক সুলতান রুকুনুদ্দিন আবু তালিব তুঘরুল বেগ এর শাসনামলে বুয়াইহরা আব্বাসি খেলাফতের সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় এবং নামমাত্র খলিফার শাসনের আড়ালে বুয়াইহরা-ই শাসন এবং শোষণ করতে থাকে। এ সময় বুয়াইহিরা শিয়া ইমামিয়্যাদেরকে তাদের মতাদর্শ প্রচার-প্রসারে সব ধরনের সুবিধা দিয়েছিলো।
শিয়া দাঈ এবং প্রচারকরা তাদের ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা দ্বারা ইরাক, পারস্য ও সিরিয়ায় ইসলামি মতাদর্শ বিরোধী বাতেনী, মুতাজিলা ও কারামাতিদের ভ্রান্ত আকিদার ফেতনা, যা ছিলো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ'র বিরোধী, তারা তা সর্বত্র ছড়িয়ে দিলো। এক্ষেত্রে বনু বুয়াইহিরা শিয়া ইসমাইলিদেরকে কোনো বাধা দেয় নি। ফলশ্রুতিতে শিয়ারা সেখানে বিভিন্ন শিক্ষা - প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই তাদের আকিদা ও মতাদর্শের প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছিল।
এছাড়া শিয়া-ইসমাইলি মতাদর্শ প্রচার এবং ফাতেমি শাসনক্ষমতাকে শক্ত ভিতের উপর প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে কায়রোতে হিজরি দশম শতাব্দীতে ফাতিমিদের প্রতিষ্ঠিত "দারুল হিকমাহ্ ও আল-আজহারের" ভূমিকা ছিলো নিরঙ্কুশ। [৫]
সুলতান আদুদুদ্দৌলার একজন শিয়া কর্মকর্তা লেখক আবু আলি ইবনু সিওয়ার (মৃত্যু -৩৭২হি.) বসরা নগরী এবং রাম হুরমুজ নগরীতে দুইটি বিশালাকারের লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিল। যারা অধ্যয়নের জন্য এবং পড়াশোনার উদ্দেশ্যে এ লাইব্রেরীগুলোতে আসতো, তাদের জন্য ভাতা ও বৃত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো। এ দুই গ্রন্থাগারের প্রথমটিতে একজন বড় আলেম মুতাজিলা আগত শিক্ষার্থীদের মতাদর্শের আলোকে ইলমুল কালাম তথা ধর্মতত্ত্ব শিক্ষা দিতেন। [৬]
শিয়া ইমামিয়্যাদের বিখ্যাত ফকিহ ছিলেন আবু জাফর তুসি মুহাম্মদ ইবনুল হাসান (মৃত্যু -৪৬০হি.)। বাগদাদে তার একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। সেখানে সেলজুকদের আক্রমণের পর শিয়াদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি আক্রমণ পরিচালিত হয়। তুসির প্রতিষ্ঠান সে হামলায় আক্রান্ত হলে তিনি নাজাফে পালিয়ে যান। ৪৪৮ হিজরিতে সে আক্রমণের সময় তুসির প্রতিষ্ঠানের সকল বই-পুস্তক লুণ্ঠিত হয়ে যায়। তুসি নতুন জায়গায় গিয়ে তার লেখালেখি, অধ্যাপণা ও গবেষণা অব্যাহত রাখেন। সেখান থেকেই তিনি ফিকহ্ ও হাদিসের অনেক কিতাব রচনা করেন। সেগুলো শিয়া ইমামিয়্যা পাঠ গবেষণার শীর্ষ স্থান দখল করে আছে।
আল-তাহজিব ও আল-ইস্তিবসার নামে দুটি কিতাব রচনা করেন। এগুলো শিয়া ইমামিয়্যাদের কাছে অধিক নির্ভরযোগ্য এবং বিশুদ্ধ চার কিতাবের অন্যতম। অথচ এ কিতাব-দুটির তথ্য-উপাত্তের উৎসও সূত্র বিচারে দূর্বল, অগ্রহণযোগ্য, গোঁজামিলপূর্ণ এবং বানোয়াট বর্ণনায় ঠাসা। অনুরুপভাবে তুসি নাজাফে তার তীর্থস্থানে বসে ছাত্রদের মাধ্যমে অনেক শ্রুতলিপিও করিয়েছিলেন, সেগুলোকে তিনি "আল-আমালি' বাম দিয়ে একটি সংকলন ও বের করেছিলেন। [৭]
এভাবেই তারা শিয়া আকিদা, মতাদর্শ প্রচার-প্রসার করে ছড়িয়ে দিতে লাগল। এসব আকিদা প্রচারে ইসমাইলি - শিয়ারা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে এবং তারাই প্রথম প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সেখানে শিয়া মতাদর্শ ও আকিদা প্রচার কেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
এছাড়া ফাতেমি খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, ফাতেমি খেলাফতের রাজধানীতে বহুমুখী শিক্ষা কর্মসূচি প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালিত হতো। এর মাধ্যমে মুসলিম জাহানের প্রত্যান্ত অঞ্চলে শিয়া-ইসমাইলি মতাদর্শ ও বিশ্বাস প্রচারের জন্য প্রশিক্ষিত দাঈ তৈরি করা হতো এবং তারা স্বাভাবিকভাবে ব্যাপকমাত্রায় মতাদর্শিক শিক্ষা - সংস্কৃতি সবকপ্রাপ্ত ছিল। তারপর এসব প্রশিক্ষিত দাঈরা ছড়িয়ে পড়ত ইসলামি দেশের আনাচে-কানাচে । সেখানে সূক্ষ্মভাবে শিয়া-ইসমাইলি মতবাদ প্রচার করত। তাদের এ নিপুণ কৌশল ও অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে ইসলামি প্রাচ্যের বহু অঞ্চলে এ মতবাদটি শিকড় গেঁড়ে নেয়।[৮]
২য় পর্ব আসছে শ্রীঘই---------
----------------------------------------------------
তথ্যঋণ-
[১]Ed(s.) " al-Nizamiyya, al-Madrasa." Encyclopedia of Islam, Second Edition
[২]bn.Wikipedia.org
[৩]ক্রুসেড যুদ্ধের অগ্রসেনানি,সেলজুক সাম্রাজ্যের ইতিহাস, ড.আলী মুহাম্মদ আস সাল্লাবি, ২য় খন্ড; পৃঃ৩৯
[৪]প্রাগুক্ত
[৫]নিজামুল মুলক, পৃঃ৩৬৫
[৬]তারিখুত তারাবিয়া ইনদাল ইমামিয়া, আব্দুল্লাহ ফাইয়াজ, পৃঃ৮৭-৮৯
[৭]তারিখুত তারাবিয়া ইনদাল ইমামিয়া, পৃঃ২৭৫,৭৬
[৮] আত তারিখুস সিয়াসি ওয়াল ফিরবি, পৃঃ১৭৯