#বাংলায়_মুসলিম_শাসন
পর্ব নম্বর-৭ঃ
বাংলার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও মুসলিম-অমুসলিম ঐক্যঃ
আমি আজকের পোষ্টে যত তথ্য জোগাড় করেছি সব তথ্যই অমুসলিমদের ইতিহাস বই থেকে জোগাড় করেছি, যাতে করে জ্ঞানপাপীদের (যারা বলে যে মুসলিম শাসনের সময়কালে অমুসলিমরা অত্যাচারের শিকার হতো) মস্তিষ্ক ধোলাই করতে পারি। কিন্তু যারা জেগে ঘুমায় তাদের কে জাগানোর ক্ষমতা কারোরই নেই।
ইলিয়াস শাহি ও হোসেন শাহি বংশের দুইশ' বৎসরব্যাপী রাজত্বকাল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই যুগে বাংলায় যেমন এক অখণ্ড ও সার্বভৌম রাজশক্তি গড়ে ওঠে, তেমনি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও উত্তর ভারতের প্রভাবমুক্ত বাংলার স্বাধীন সত্তা ও ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটে।
হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ও ধর্মীয় উদারতা এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই দুই রাজবংশের শাসকরা স্থানীয় অমুসলমানদের উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করে এক হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রশাসন গড়ে তোলেন। এ প্রসঙ্গে ইলিয়াস শাহি বংশের বারবক শাহের রাজত্বকালে কেদার রায়, গন্ধর্ব বায়, মুকুন্দ প্রমুখ সভাসদ, ব্যক্তিগত চিকিৎসক অনন্ত সেন এবং হোসেন শাহের আমলে উজির গোপীনাথ বসু (পুরন্দর খাঁ), ব্যক্তিগত সচিব রূপ ও রাজস্ব মন্ত্রী সনাতন গোস্বামী, সেনাপতি গৌর মল্লিক, টাকশালের অধিকর্তা অনুপ, দেহরক্ষী কেশব ছেত্রী, ব্যক্তিগত চিকিৎসক মুকুন্দ দাস-এর নাম করা যায়।
বাংলা সাহিত্যের বিকাশের ক্ষেত্রেও এই যুগ উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ইলিয়াস শাহি যুগে কৃত্তিবাস-এর রামায়ণ রচিত হয়। ‘শরফনামা’ নামক ফার্সি শব্দকোষ প্রণেতা ইব্রাহিম কায়ুম ফারুকি, কবি কৃত্তিবাস ও বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত বৃহস্পতি মিশ্র, সুলতান বারবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। বৃহস্পতি মিশ্রের বিখ্যাত গ্রন্থ হল 'অমরকোষ'-এর টীকা ‘পদচন্দ্রিকা'। এছাড়া তিনি গীতগোবিন্দ, কুমারসম্ভব, রঘুবংশ প্রভৃতি বহু গ্রন্থের টীকাকার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। বারবক শাহ তাঁকে ‘পণ্ডিত সার্বভৌম' উপাধি দেন। কবি কৃত্তিবাস নিজেই সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতার কথা স্বীকার করেছেন।
মালাধর বসু, যশোরাজ খাঁ, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, শ্রীকর নন্দী, দামোদর, কবিরঞ্জন, শ্রীধর, বিজয়গুপ্ত প্রমুখ সাহিত্যিকগণ হোসেন শাহের প্রশংসা ও পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। তাঁর আদেশে মালাধর বসু শ্রীমদ্ভাগবত-এর বাংলা অনুবাদ করেন। এজন্য তিনি মালাধর বসুকে গুণরাজ খাঁ উপাধি দেন। মালাধর বসুর পুত্রও তাঁর কাছ থেকে সত্যরাজ খাঁ উপাধি পান। বৈষ্ণব রূপ গোস্বামী সংস্কৃতে 'বিদগ্ধ মাধব' ও 'ললিত মাধব’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর সেনাপতি প্রাগল খাঁ-র পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারত-এর বাংলা অনুবাদ করেন। রঘুনাথ, রঘুনন্দন ও শ্রীচৈতন্য-র আবির্ভাব হয় এই যুগেই। এছাড়াও এই যুগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ-এর 'চৈতন্যচরিতামৃত', বিপ্রদাস পিপিলাই-এর 'মনসামঙ্গল', জয়ানন্দ-র 'চৈতন্যমঙ্গল' রচিত হয়। হোসেন শাহের মৃত্যুর সামান্য পরেই জ্ঞান দাস, গোবিন্দ দাস প্রমুখ বৈষ্ণব পদকর্তাদের আবির্ভাব হয়। তাঁর পুত্র নসরৎ শাহ-ও বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য ও দর্শনের আলোচনায় নবদ্বীপ তখন ভারতবিখ্যাত ছিল।
এই যুগে সংগীত ও হস্তলিপি বিদ্যার প্রভূত উন্নতি ঘটে। রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই তা সম্ভব হয়। আরবি ও পারসিক ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি এবং বিভিন্ন মুদ্রায় হস্তলিপি-বিদ্যার উন্নতির পরিচয় পাওয়া যায়। হোসেন শাহি যুগের সংগীত সম্পর্কে বিশেষ তথ্যাদি না মিললেও জানা যায় যে, এই যুগে সংগীতের জন্য বিশেষ ধরনের কাব্য রচনার প্রচলন ছিল। সমকালীন বাংলা কাব্যে 'কেদার', 'ধানশ্রী','মল্লার', 'ভৈরবী প্রভৃতি রাগ-রাগিনীর উল্লেখ আছে। উত্তর ভারতে প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সংগীতের ধারা বাংলায় প্রচলিত ছিল। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রেও এই যুগ স্মরণীয়।
ইলিয়াস শাহি বংশের সিকান্দার শাহ বিখ্যাত 'আদিনা মসজিদ' ছাড়াও 'আলি সিরাজউদ্দিন', 'কোতওয়ালি দরওয়াজা' প্রভৃতি সমাধিস্থল ও মসজিদ নির্মাণ করেন এবং পাণ্ডুয়াকে বিভিন্ন হর্ম্য ও মসজিদ দ্বারা শোভিত করেন। বিখ্যাত 'আদিনা মসজিদ'-টি সম্পর্কে ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন “স্থাপত্য কৌশলের বিচারে এই মসজিদটি অতুলনীয়। ভারতবর্ষে নির্মিত সমস্ত মসজিদের মধ্যে আদিনা মসজিদ আয়তনের দিক থেকে দ্বিতীয়।"হোসেন শাহ-র আমলের ছোট সোনা মসজিদ এবং নসরৎ শাহ-র আমলের বড় সোনা মসজিদ ও কদম রসুল এবং হোসেন শাহ-র সমাধির ওপর এক লক্ষ টাকা ব্যয়ে তৈরি পান্ডুয়ার একলাখি মসজিদ এ যুগের স্থাপত্য কীর্তির উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মধ্যযুগের বাংলায় স্থাপত্য শিল্পের যে সব নিদর্শন পাওয়া গেছে তার অধিকাংশই ইলিয়াস শাহি ও হোসেন শাহি আমলে নির্মিত হয়।
ব্রাহ্মণ্য, বৈষ্ণব ও শৈব ধর্ম ছাড়াও এই যুগে নাথ, ধর্মঠাকুর, মনসা ও চণ্ডী প্রভৃতি ধর্মমতের উদ্ভব হয়। মনসা ও চণ্ডীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বহু কাব্য ও গ্রন্থ রচিত হয়।
মোটকথা এই যুগে সর্বশ্রেণীর মানুষ একসাথে শান্তিপূর্ণ ভাবে বসবাস করতো। বিশেষ করে হোসেন শাহী রাজবংশ অনেক হিন্দুকে সরকারে নিয়োগ করেছিল এবং একধরনের বহু ধর্মীয় সহানুভুতি এর প্রচার করেছিল। যারা বলে থাকে যে মুসলিম শাসনের সময় অমুসলিমরা অত্যাচারের শিকার হতো তাদেরকে অবশ্যই বাংলার সুলতানি পিরিয়ডের ইতিহাস জানা উচিত। ঐতিহাসিক বি. এন. রায় তাঁর (আলাউদ্দিন হোসেন শাহ) রাজত্বকালকে “মধ্যযুগের বাংলার সর্বাপেক্ষা গৌরবজনক অধ্যায়” বলে চিহ্নিত করেছেন। স্যার যদুনাথ সরকার-এর মতে, তিনি ছিলেন প্রশ্নাতীতভাবে মধ্যযুগের বাংলার, মহত্তম না হলেও, সর্বোত্তম শাসক। ডক্টর কে কে দত্ত বলেন, "একজন আলোকিত এবং জ্ঞানী ব্যক্তি হোসেন শাহ ছিলেন বাংলার সিংহাসনে আরোহণকারী সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসকদের একজন।"
তথ্যসূত্রঃ
১) স্বদেশ পরিচয়, জীবন মুখোপাধ্যায়
(২) History of Bengal, JN Sarkar, vol. II , P. 151
(৩) Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society. Cambridge University Press
(৪) Banglapedia
Quote:
1. "He founded the Bengali Husayn Shahi dynasty, which ruled from 1493 to 1538, and was known to be tolerant to Hindus, employing many on them in his service and promoting a form of religious pluralism" David Lewis (31 October 2011). Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society. Cambridge University Press. pp. 44–45.
2. "An enlightened and wise man Husain Shahr was one of the most popular rulers that ascended the throne of Bengal."-Dr K. K Duta, vide An Advanced History of India, pp. 346.
3. "Alauddin Husain Shah was unquestionably the best, if not the greatest, of the medieval rulers of Bengal"-J N Sirkar.
![]() |
| Persian Literature |

