তালিকোটা যুদ্ধ

১৫৬৫ সালের ২৬ জানুয়ারি দক্ষিণ ভারতের সর্বশেষ হিন্দু সম্রাজ্য- বিজয়নগর এর পতন ঘটে। ওখানকার রাজা সদাশিব রায়কে গৃহবন্দি করে রেখে আলিয়া রাম রায় রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। তিনি মুসলিম শাসকদের অভ্যান্তরীণ কলহের সুযোগে বিজয়নগর সম্রাজ্যকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন।

.
পতনের কিনারায় দাঁড়িয়ে মুসলিম শাসকরা ১৫৬৪ সালে ঐক্যবদ্ধ হন। তারা আন্তঃপারিবারিক বিবাহের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সমাধান করে ফেলেন এবং অবশেষে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একত্রিত হন। বিজয়নগর সেনাবাহিনী বৃহৎ ও সুগঠিত হলেও অত্যাচারের কারণে জনগণ রাজাকে অপছন্দ করত।
.
তালিকোটা শহরটি বিজাপুরের দক্ষিণ-পূর্বে ৮০ কিমি দূরে, উত্তর কর্ণাটকে অবস্থিত। ২৯ ডিসেম্বর ১৫৬৪ তারিখে কুতুব শাহ ও নিজাম শাহ এর নেতৃত্বে এখানে প্রথম অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু কয়েক হাজার সৈন্য হারিয়ে তাঁদের বিশৃঙ্খল অবস্থায় পালিয়ে যেতে হয় এবং তাঁদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।



সুলতানরা পুনরায় প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বেরারের সুলতান ইমাদ শাহ কৃষ্ণ দুর্গের পাহারাদার তিরুমালা দেব রায়ের ডিভিশন আক্রমণ করে প্রথম ধাক্কা দেন। তিরুমালার প্রভূত ক্ষতি সাধিত হলেও তীব্র সংঘর্ষে সুলতানের সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি কোনরকমে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন।
.
এদিকে সুলতান নিজাম শাহ, কুতুব শাহ, বারিদ শাহ ও আদিল শাহ এর সম্মিলিত বাহিনী কৃষ্ণনগর অতিক্রম করে হামলা করতে এগিয়ে আসেন। আকস্মিক ঘটনায় রাম রায় হতবাক হয়ে যান। তিনি দ্রুত সেনাবাহিনী একত্রিত করেন। তিরুমালা ও অন্যান্য শাসক ও সেনাপতিরাও বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রে এসে যোগ দেন।
.
রাক্ষসী ও টাঙ্গাদি গ্রামের সমতল ভূমিতে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল ৮০ হাজার পদাতিক, ৩০ হাজার অশ্বারোহী ও অর্ধশত কামান নিয়ে। বিপরীতে রাম রায়ের বাহিনী গঠিত হয়েছিল ১ লক্ষ ৪০ হাজার পদাতিক, ১০ হাজার অশ্বারোহী, শতাধিক রণহস্তী ও অজানা সংখ্যক কামান নিয়ে।
.
১৫৬৫ সালের ২৩শে জানুয়ারি যুদ্ধ শুরু হয়। রাম রায়ের সেনাপতি ভেঙ্কটাদ্রি প্রথম আঘাত হানেন। তার বাহিনীর ভারী কামানের ব্যাপক ফায়ারের সামনে দুই ঘণ্টার মধ্যে বারিদ শাহের সেনাদল নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ভেঙ্কটাদ্রির পদাতিক বাহিনী বারিদ শাহের দলের মধ্যে ঢুকে তাদের প্রায় ধ্বংস করে ফেলে।
.
দেখে মনে হচ্ছিল- রাম রায়ের বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। কুতুব শাহও পশ্চাদপসরণে উদ্যাত ছিলেন। তখন নিজাম শাহ নিজে সৈন্য পরিচালনা শুরু করেন। তিনিও ভারী কামানের প্রবল চাপে পড়েন। এই চাপ তিনি নিজে গ্রহণ করেন এবং অবশিষ্ট বাহিনীকে রাম রায়ের পেছনে যেতে আদেশ করেন।
.
হঠাৎ রাম রায় দেখতে পান যে, তার ফ্ল্যাংক এলোমেলো হয়ে গেছে। এমনকি তার কয়েকটি আর্টিলারি অবস্থান বেদখল হয়ে গেল। এখন তার হাতিগুলো নিজেদের কামানের ছোঁড়া গোলায় আঘাতপ্রাপ্ত হতে থাকল। তার নিজের হাতিটি আক্রান্ত হলে তিনি তা থেকে পড়ে যান। উঠে দাঁড়ানোর পূর্বেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যান।
.
রাম রায়কে যুদ্ধ বন্ধের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তখনও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী রাম রায় তার অস্বীকার করেন। তখন তার দেহ থেকে গলা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং খণ্ডিত মাথাটি খুঁটিতে উড্ডয়ন করে হিন্দু সৈন্যদের সামনে উত্তোলন করা হয়েছিল। রাজার মৃত্যুতে হিন্দুরা আতঙ্কিত হয়ে পালাতে শুরু করে।
.
কুতুব শাহ, নিজাম শাহ ও বারিদ শাহ তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে সমন্বিত হামলা চালিয়ে ভেঙ্কটাদ্রিকে নিহত করেন। তিরুমালা তখনও কেন্দ্রকে স্থির রাখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিজয়নগরের আর্টিলারি ততক্ষণে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে, আদিল শাহের বাহিনী তার পিছন দিয়ে চূড়ান্ত আক্রমণ করে বসে।
.
তিরুমালা পালিয়ে যান। যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। রাজ্যের পরাজয় ঘটলেও সুলতানরা তার দখল নেননি। বিজয়নগরে যখন খবর পৌছাল যে, রামরায় নিহত হয়েছেন এবং সেনাবাহিনী যুদ্ধে হেরে গেছে, লোকেরা তা বিশ্বাস করল না। কারণ বিগত ২০০ বছর ধরে বিজয়নগর কখনও পরাজিত হয়নি।
.
তিরুমালা ফিরে এসে ভেঙ্কটাদ্রির প্রাসাদে ঢুকে তার পরিবার সদস্যদের হত্যা করে পালিয়ে যায়। এই সুযোগে স্থানীয় ডাকাতরা, রাজা ঘোরপাড়ে বাহাদুরের মহারট্ট হিন্দু দল, মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ দল, মুরারি রাওপ্রভৃতি হিন্দু দল এসে শহরে ব্যাপক লুটপাট করতে থাকে। তখন রাস্তার ধারে সোনা এবং হীরা বিক্রি হতো।
.
সুলতানরা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে বিরোধ চাইছিলেন না। কিন্তু ভয়াবহ লুটপাট দমনে ৬ মাস পর তাঁদের পুনরায় এগিয়ে আসতে হয়। তাদের সাথে ডাকাতদের সংঘাত হয়। ডাকাতরা পালিয়ে যাবার পূর্বে শহরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, এতে একটি গ্রানাইট পাহাড়ে ফাটল ধরেছিল।
.
পরাজয়ের কারণ
১) মুসলিম সেনাপতিরা দ্রুতগামী পার্সিয়ান ঘোড়ার পিঠে চলে দ্রুত শত্রুর মাঝে ঢুকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিজয়নগরের সেনাপতিরা হাতির পিঠে আরোহী ছিলেন। ফলে, তাদের গতি ছিল অনেক কম।
২) বিজয়নগর বাহিনীর প্রধান তিনজন সেনাপতিই ছিলেন বৃদ্ধ; কিন্তু সুলতানি সেনাবাহিনীর সকল সেনাপতি ছিলেন তরুন।
৩) বিজয়নগর পদাতিক বাহিনী বাঁশের তৈরি ধনুক-এর উপর নির্ভর করত। কিন্তু সুলতানি বাহিনী তখন ধাতুর তৈরি ক্রসবো ব্যবহার করত, যা নির্ভুলতা ও দূরত্বের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ছিল।
৪) বিজয়নগরের পদাতিক বাহিনী ৭ ফুট লম্বা বর্শা ব্যবহার করত, যেখানে সুলতানি বাহিনী ঘোড়ার পিঠে বসে ১৫ ফুট দীর্ঘ বর্শা ব্যবহার করত।
৫) আলিয়া রাম রায় পরিবার ও আত্মীয়দের মাঝে অত্যান্ত অজনপ্রিয় ছিলেন। তিনি প্রতিবেশী সাম্রাজ্য লুণ্ঠন করতেন।
৬) সুলতানি বাহিনীতে তখন বিশ্বের সর্বাধুনিক কামান ব্যবহৃত হতো। বিজয় নগরের আর্টিলারি ছিল বটে, কিন্তু তারা আর্টিলারির সুরক্ষায় মনোযোগী ছিল না।
৭) রাম রায় নিহত হলেও প্রতিপক্ষের তুলনায় তার সৈন্য অনেক বেশি ছিল, কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ ছিল না। মুসলিম সৈন্যরা তাদের ধাওয়া করে এবং পথে হত্যা করে। সেদিন এক লাখের বেশি সেনা নিহত হয়।
.
পুনশ্চঃ এই যুদ্ধের ঘটনা বিশেষ ভাবে জেনে রাখা প্রয়োজন। ইতিহাস সাক্ষী যে, সুলতানরা আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করেছেন; তারা বিজয়ী হলেও শহর দখল করেননি, বরং পরাজিত তিরুমামালার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিরুমালা রাজপ্রসাদ লুট করে পালিয়ে গিয়েছেন। হিন্দু ডাকাত ও সামন্ত রাজারা বিজয়নগর লুট ও ধর্ষণ করেছিল। কিন্তু একালে ঐ সকল লুটপাটের দায় সুলতানদের উপর চাপানো হয়ে থাকে।
.তালিকোটা যুদ্ধ
[জেনে রাখুন] . ১৫৬৫ সালের এইদিনে (২৬ জানুয়ারি) দক্ষিণ ভারতের সর্বশেষ হিন্দু সম্রাজ্য- বিজয়নগর এর পতন ঘটে। ওখানকার রাজা সদাশিব রায়কে গৃহবন্দি করে রেখে আলিয়া রাম রায় রাজ্য পরিচালনা করছিলেন। তিনি মুসলিম শাসকদের অভ্যান্তরীণ কলহের সুযোগে বিজয়নগর সম্রাজ্যকে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিলেন। . পতনের কিনারায় দাঁড়িয়ে মুসলিম শাসকরা ১৫৬৪ সালে ঐক্যবদ্ধ হন। তারা আন্তঃপারিবারিক বিবাহের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সমাধান করে ফেলেন এবং অবশেষে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একত্রিত হন। বিজয়নগর সেনাবাহিনী বৃহৎ ও সুগঠিত হলেও অত্যাচারের কারণে জনগণ রাজাকে অপছন্দ করত। . তালিকোটা শহরটি বিজাপুরের দক্ষিণ-পূর্বে ৮০ কিমি দূরে, উত্তর কর্ণাটকে অবস্থিত। ২৯ ডিসেম্বর ১৫৬৪ তারিখে কুতুব শাহ ও নিজাম শাহ এর নেতৃত্বে এখানে প্রথম অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু কয়েক হাজার সৈন্য হারিয়ে তাঁদের বিশৃঙ্খল অবস্থায় পালিয়ে যেতে হয় এবং তাঁদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। . সুলতানরা পুনরায় প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বেরারের সুলতান ইমাদ শাহ কৃষ্ণ দুর্গের পাহারাদার তিরুমালা দেব রায়ের ডিভিশন আক্রমণ করে প্রথম ধাক্কা দেন। তিরুমালার প্রভূত ক্ষতি সাধিত হলেও তীব্র সংঘর্ষে সুলতানের সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনি কোনরকমে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। . এদিকে সুলতান নিজাম শাহ, কুতুব শাহ, বারিদ শাহ ও আদিল শাহ এর সম্মিলিত বাহিনী কৃষ্ণনগর অতিক্রম করে হামলা করতে এগিয়ে আসেন। আকস্মিক ঘটনায় রাম রায় হতবাক হয়ে যান। তিনি দ্রুত সেনাবাহিনী একত্রিত করেন। তিরুমালা ও অন্যান্য শাসক ও সেনাপতিরাও বাহিনী নিয়ে কেন্দ্রে এসে যোগ দেন। . রাক্ষসী ও টাঙ্গাদি গ্রামের সমতল ভূমিতে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনী গঠিত হয়েছিল ৮০ হাজার পদাতিক, ৩০ হাজার অশ্বারোহী ও অর্ধশত কামান নিয়ে। বিপরীতে রাম রায়ের বাহিনী গঠিত হয়েছিল ১ লক্ষ ৪০ হাজার পদাতিক, ১০ হাজার অশ্বারোহী, শতাধিক রণহস্তী ও অজানা সংখ্যক কামান নিয়ে। . ১৫৬৫ সালের ২৩শে জানুয়ারি যুদ্ধ শুরু হয়। রাম রায়ের সেনাপতি ভেঙ্কটাদ্রি প্রথম আঘাত হানেন। তার বাহিনীর ভারী কামানের ব্যাপক ফায়ারের সামনে দুই ঘণ্টার মধ্যে বারিদ শাহের সেনাদল নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ে। ভেঙ্কটাদ্রির পদাতিক বাহিনী বারিদ শাহের দলের মধ্যে ঢুকে তাদের প্রায় ধ্বংস করে ফেলে। . দেখে মনে হচ্ছিল- রাম রায়ের বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। কুতুব শাহও পশ্চাদপসরণে উদ্যাত ছিলেন। তখন নিজাম শাহ নিজে সৈন্য পরিচালনা শুরু করেন। তিনিও ভারী কামানের প্রবল চাপে পড়েন। এই চাপ তিনি নিজে গ্রহণ করেন এবং অবশিষ্ট বাহিনীকে রাম রায়ের পেছনে যেতে আদেশ করেন। . হঠাৎ রাম রায় দেখতে পান যে, তার ফ্ল্যাংক এলোমেলো হয়ে গেছে। এমনকি তার কয়েকটি আর্টিলারি অবস্থান বেদখল হয়ে গেল। এখন তার হাতিগুলো নিজেদের কামানের ছোঁড়া গোলায় আঘাতপ্রাপ্ত হতে থাকল। তার নিজের হাতিটি আক্রান্ত হলে তিনি তা থেকে পড়ে যান। উঠে দাঁড়ানোর পূর্বেই তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। . রাম রায়কে যুদ্ধ বন্ধের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তখনও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী রাম রায় তার অস্বীকার করেন। তখন তার দেহ থেকে গলা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং খণ্ডিত মাথাটি খুঁটিতে উড্ডয়ন করে হিন্দু সৈন্যদের সামনে উত্তোলন করা হয়েছিল। রাজার মৃত্যুতে হিন্দুরা আতঙ্কিত হয়ে পালাতে শুরু করে। . কুতুব শাহ, নিজাম শাহ ও বারিদ শাহ তাদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে সমন্বিত হামলা চালিয়ে ভেঙ্কটাদ্রিকে নিহত করেন। তিরুমালা তখনও কেন্দ্রকে স্থির রাখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বিজয়নগরের আর্টিলারি ততক্ষণে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে, আদিল শাহের বাহিনী তার পিছন দিয়ে চূড়ান্ত আক্রমণ করে বসে। . তিরুমালা পালিয়ে যান। যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। রাজ্যের পরাজয় ঘটলেও সুলতানরা তার দখল নেননি। বিজয়নগরে যখন খবর পৌছাল যে, রামরায় নিহত হয়েছেন এবং সেনাবাহিনী যুদ্ধে হেরে গেছে, লোকেরা তা বিশ্বাস করল না। কারণ বিগত ২০০ বছর ধরে বিজয়নগর কখনও পরাজিত হয়নি। . তিরুমালা ফিরে এসে ভেঙ্কটাদ্রির প্রাসাদে ঢুকে তার পরিবার সদস্যদের হত্যা করে পালিয়ে যায়। এই সুযোগে স্থানীয় ডাকাতরা, রাজা ঘোরপাড়ে বাহাদুরের মহারট্ট হিন্দু দল, মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ দল, মুরারি রাওপ্রভৃতি হিন্দু দল এসে শহরে ব্যাপক লুটপাট করতে থাকে। তখন রাস্তার ধারে সোনা এবং হীরা বিক্রি হতো। . সুলতানরা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে বিরোধ চাইছিলেন না। কিন্তু ভয়াবহ লুটপাট দমনে ৬ মাস পর তাঁদের পুনরায় এগিয়ে আসতে হয়। তাদের সাথে ডাকাতদের সংঘাত হয়। ডাকাতরা পালিয়ে যাবার পূর্বে শহরে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের তাপ এতটাই তীব্র ছিল যে, এতে একটি গ্রানাইট পাহাড়ে ফাটল ধরেছিল। . পরাজয়ের কারণ ১) মুসলিম সেনাপতিরা দ্রুতগামী পার্সিয়ান ঘোড়ার পিঠে চলে দ্রুত শত্রুর মাঝে ঢুকে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু বিজয়নগরের সেনাপতিরা হাতির পিঠে আরোহী ছিলেন। ফলে, তাদের গতি ছিল অনেক কম। ২) বিজয়নগর বাহিনীর প্রধান তিনজন সেনাপতিই ছিলেন বৃদ্ধ; কিন্তু সুলতানি সেনাবাহিনীর সকল সেনাপতি ছিলেন তরুন। ৩) বিজয়নগর পদাতিক বাহিনী বাঁশের তৈরি ধনুক-এর উপর নির্ভর করত। কিন্তু সুলতানি বাহিনী তখন ধাতুর তৈরি ক্রসবো ব্যবহার করত, যা নির্ভুলতা ও দূরত্বের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ছিল। ৪) বিজয়নগরের পদাতিক বাহিনী ৭ ফুট লম্বা বর্শা ব্যবহার করত, যেখানে সুলতানি বাহিনী ঘোড়ার পিঠে বসে ১৫ ফুট দীর্ঘ বর্শা ব্যবহার করত। ৫) আলিয়া রাম রায় পরিবার ও আত্মীয়দের মাঝে অত্যান্ত অজনপ্রিয় ছিলেন। তিনি প্রতিবেশী সাম্রাজ্য লুণ্ঠন করতেন। ৬) সুলতানি বাহিনীতে তখন বিশ্বের সর্বাধুনিক কামান ব্যবহৃত হতো। বিজয় নগরের আর্টিলারি ছিল বটে, কিন্তু তারা আর্টিলারির সুরক্ষায় মনোযোগী ছিল না। ৭) রাম রায় নিহত হলেও প্রতিপক্ষের তুলনায় তার সৈন্য অনেক বেশি ছিল, কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ ছিল না। মুসলিম সৈন্যরা তাদের ধাওয়া করে এবং পথে হত্যা করে। সেদিন এক লাখের বেশি সেনা নিহত হয়। . পুনশ্চঃ এই যুদ্ধের ঘটনা বিশেষ ভাবে জেনে রাখা প্রয়োজন। ইতিহাস সাক্ষী যে, সুলতানরা আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করেছেন; তারা বিজয়ী হলেও শহর দখল করেননি, বরং পরাজিত তিরুমামালার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিরুমালা রাজপ্রসাদ লুট করে পালিয়ে গিয়েছেন। হিন্দু ডাকাত ও সামন্ত রাজারা বিজয়নগর লুট ও ধর্ষণ করেছিল। কিন্তু একালে ঐ সকল লুটপাটের দায় সুলতানদের উপর চাপানো হয়ে থাকে। . Written by Mohammad Salimullah

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন