#বাংলায়_মুসলিম_শাসন
পর্ব নম্বর-৪ঃ
গত পর্বে আমরা ইলিয়াস শাহী বংশ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আমরা দেখেছিলাম যে, ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হাবসি ক্রীতদাস শাহজাদা বারবক, জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ ( রাজত্বকালঃ ১৪৮১-১৪৮৭) হত্যা করে ইলিয়াস শাহী বংশের অবসান ঘটান। এর ফলে বাংলায় সূচনা হয় হাবসি বংশের রাজত্ব।
হাবসি বংশের রাজাদের লিস্টঃ
বারবক শাহ (১৪৮৭)
সাইফুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৯০)
দ্বিতীয় নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৯০)
শামসুদ্দীন মুজাফ্ফর শাহ (১৪৯০-১৪৯৩)
সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
ইলিয়াস বংশের শাসক জালালউদ্দিন ফাতেহ শাহ-এর রাজত্বে ইথিওপীয়রা (হাবশি) রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন। জালালউদ্দিন তার অধিকার পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। কিন্তু প্রাসাদরক্ষীদের সর্বাধিনায়ক বারবক তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। অনতিবিলম্বে জালালউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। শাহজাদা বারবক ক্ষমতা দখল করেন এবং সুলতান শাহজাদা নাম নিয়ে ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু বারবকের রাজত্ব ছিল অতি ক্ষণস্থায়ী। অভিষেকের বছরেই সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ নামক ইলিয়াস বংশের একজন ভূতপূর্ব সেনাপতি তাকে হত্যা করেন। সাইফউদ্দিন নিজেও জাতিগতভাবে হাবশি ছিলেন।
সুলতান সাইফ-উদ-দীন ফীরূজ শাহ হাবশীদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা যোগ্য লোক ছিলেন। তিনি উদার এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কে কাহিনী প্রচলিত আছে। তিনি এত বেশি দান করতেন যে, লোকে অবাক হয়ে যেত এবং তাঁর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও বলাবলি করত যে এই হাবশী বিনা পরিশ্রমে যে অর্থের মালিক হয়েছেন, তার মূল্য তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি একদিনেই গরীবদের মধ্যে এক লাখ টাকা দান করেন। তিনি মসজিদ, মিনার এবং গৌড়ে জলাশয় তৈরী করেন। তাঁর নির্মিত মিনারটি ফিরুজা মিনার নামে পরিচিত। মাত্র ৩ বৎসর রাজত্ব করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কেউ কেউ বলেন তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, আবার কারো কারো মতে পাইকরা তাঁকে হত্যা করে। শেষোক্ত মত গ্রহণযোগ্য বলে বর্তমানে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন।
সাইফ-উদ-দীন ফীরূজ শাহের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহের প্রকৃত নাম এবং পরিচিতি নিয়ে বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি ছিল। বলা হত যে, তাঁর নাম নাসির-উদ-দীন মাহমুদ শাহ, এবং পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশে একজন নাসির-উদ-দীন মাহমুদ শাহ থাকায় এই সুলতানকে দ্বিতীয় নাসির-উদ-দীন মাহমুদ শাহ বলা হত। তিনি কি সাইফ-উদ-দীন ফীরূজ শাহের পুত্র ছিলেন নাকি জালাল-উদ দীন ফতেহ শাহের পুত্র ছিলেন সেই বিষয়েও মতভেদ ছিল। বর্তমানে তাঁর মুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় বিতর্কের অবসান হয়েছে। এখন নিশ্চিত ভাবে জানা যাচ্ছে যে, তাঁর নাম কুতব-উদ্-দীন মাহমুদ শাহ এবং তিনি সাইফ-উদ-দীন ফীরজ শাহের পুত্র ছিলেন।
কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহের সময় হাবাশ খান নামক একজন হাবশী গোলাম প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন। তাঁর প্রভাব এত ব্যাপক হয় যে, সুলতানের কোন ক্ষমতাই ছিল না, অর্থাৎ সুলতান হাবশ খানের ক্রীড়নকে পরিণত হন। এতে অন্যান্য হাবশীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। সিদি-বদর দিওয়ানা নামে একজন হাবশী ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন এবং উভয়েই সুলতানকে সরিয়ে নিজে সিংহাসনে বসার জন্য চেষ্টিত হন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সিদি বদর দিওয়ানা জয়লাভ করেন। তিনি প্রথমে হাবাশ খানকে হত্যা করেন এবং পরে সুলতান কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহকেও হত্যা করে নিজে সুলতান শামস-উদ-দীন মুজাফফর শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন।
সুলতান শামস-উদ-দীন মুজাফফর শাহ সম্পর্কে পরস্পর বিরোধি তথ্য পাওয়া যায়, এই মন্তব্যগুলোর সারমর্ম নিম্নরূপ :
মুজাফফর শাহ বিশ্বাসঘাতকতা করে কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহকে হত্যা করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির লোক ছিলেন এবং অনেক ধার্মিক, পণ্ডিত এবং অভিজাত লোকের প্রাণনাশ করেন। সৈয়দ হোসেন নামক এক ব্যক্তিকে তিনি উজীর নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে রাজ্য শাসনের ভার দেন। উজীরের পরামর্শে মুজাফফর শাহ প্রজাদের শোষণ ও নির্যাতন করেন, সৈন্যদের বেতন কমান এবং ধনরত্ন জমা করেন। ফলে প্রজারা, এমনকি অমাত্যরাও বিক্ষুদ্ধ হয়। উজীর সৈয়দ হোসেনও বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেন। কারো কারো মতে মুজাফফর শাহ বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন। আবার কারো কারো মতে উজীর সৈয়দ হোসেন প্রাসাদ রক্ষীদের বশে এনে প্রাসাদে ঢুকে সুলতানকে হত্যা করেন।
মুজাফফ্ফর শাহ সম্পর্কে উপরে যে ধারণা দেয়া হয়েছে, তা সর্বাংশে সত্য নাও হতে পারে। তাঁর সময়ে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে তাঁকে একজন বিদ্বান লোক হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে। এই শিলালিপির কোন কোনটি সূফীদের দরগায় উৎকীর্ণ। সম্প্রতি আবিষ্কৃত তাঁর মুদ্রায় তাঁকে 'কামতা মৰ্দ্দন' বা কামতা বিজয়ী রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মনে হয় তাঁর সময়ে কিছু রাজ্য ও বিজিত হয়। উজীর সৈয়দ হোসেন তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করায় মনে হয় যে তিনি চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হন এবং তাঁর চরিত্রেও কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা করা হয়েছে। সে যাই হোক, সুলতান শামস-উদ-দীন মুজাফফর শাহ ৩ বৎসর রাজত্ব করে ১৪৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নিহত হন, হাবশীদের শাসনকালও শেষ হয়।
হাবশীদের মধ্যে ৪ জন সুলতান রাজত্ব করেন। ৪ জনেই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেন অর্থাৎ ঘাতকদের হাতে নিহত হন। এই ৪ জন সুলতান মিলে মাত্র ৬ বৎসরকাল রাজত্ব করেন। তার মধ্যে গিয়াস-উদ-দীন বারবক এবং কুতব-উদ-দীন মাহমুদ শাহের রাজত্বকাল কয়েকমাসের বেশি হবে না। অতএব ধরে নেয়া যায় যে, হাবশী আমল মোটামুটিভাবে বলতে গোলে অরাজকতায় পরিপূর্ণ ছিল। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে হাবশীদের উৎখাত করে সুলতান আলা-উদ-দীন হোসেন শাহ, হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হাবশীদের দেশ থেকে বের করে দিয়ে দেশকে হাবশী মুক্ত করেন। পরবর্তী পর্বে আমরা হোসেন শাহী বংশ নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
চলবে......
তথ্যসূত্রঃ
(১) ABM Shamsuddin Ahmed, Jalaluddin Fath Shah , Banglapedia: The National Encyclopedia of Bangladesh, Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka
(২) বাংলার ইতিহাস, আব্দুল করিম।
(৩) Wikipedia