#বাংলায়_মুসলিম_শাসন
পর্ব নম্বর-৩ঃ
ইলিয়াস শাহী রাজবংশ____________
ইলিয়াস শাহী বংশের রাজাদের লিস্টঃ
(প্রথম পর্ব)
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮) (১৩৪২ থেকে পশ্চিম বাংলার লখনৌতি রাজ্যের সুলতান এবং ১৩৫২ থেকে পুরো বাংলায়)
প্রথম সিকান্দর শাহ (১৩৫৮-১৩৯০)
গিয়াসুদ্দীন আজম শাহ (১৩৯০-১৪১১)
সাইফুদ্দীন হামজা শাহ (১৪১১-১৪১৩)
মুহাম্মদ শাহ (১৪১৩)
(দ্বিতীয় পর্ব)
প্রথম নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯)
রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪)
শামসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১)
দ্বিতীয় সিকান্দর শাহ (১৪৮১)
জালালুদ্দীন ফতেহ শাহ (১৪৮১-১৪৮৭)
ইলিয়াস শাহী রাজবংশ ছিল বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজবংশ। এই রাজ্যের প্রথম বিখ্যাত রাজা ছিলেন শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। তিনি দিল্লির অধীন থেকে বাংলাকে আজাদ করে বাংলায় আজাদ সুলতানী কায়েম করেন। শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যদিও তার রাজধানী পান্ডুয়ায় স্থাপন করেন, পরবর্তীতে ১৪৫৩ সালে নাসিরউদ্দীন মাহমুদ সেই রাজধানীকে লখনৌতিতে (বর্তমান মালদা ও বাংলাদেশের কিছু অংশ) স্থাপন করেন।
ডঃ যদুনাথ সরকার বলেন যে, "লক্ষ্মণাবতির সিংহাসনে ইলিয়াস শাহের আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ইতিহাসে এক নবযুগের সূচনা হয়"। ডঃ নুরুল হাসান
বলেন “ইলিয়াস শাহ বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবময় যুগের সূচনা করেন।” তিনি বাংলার তিনটি অংশকে একত্র করে একটি শক্তিশালী রাজ্য স্থাপন করেন। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নেপাল আক্রমণ করেন এবং রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রচুর ধনরত্নসহ বাংলায় ফিরে আসেন। তিনি উড়িষ্যা ও ত্রিহুত (উত্তর বিহার) রাজ্যকে করদ রাজ্যে পরিণত করে বারাণসী পর্যন্ত তাঁর আধিপত্য বিস্তৃত করেন। তিনি কামরূপ আক্রমণ করেন, কিন্তু এর ফলাফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকেরা একমত নন। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন বাংলাকে জয় করার উদ্দেশ্যে দিল্লির সুলতান ফিরোজ তুঘলক ৯০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করেন। দিল্লির সেনাদলকে কোন বাধা না দিয়ে ইলিয়াস শাহ সপরিবারে দিনাজপুরের একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। নদীবেষ্টিত এই দুর্গটি কার্যত দুর্ভেদ্য ছিল। কয়েকমাস অবরোধের পরেও ফিরোজ তুঘলক বাংলার নবাবের কোন ক্ষতি করতে পারেননি বরং বাংলার প্রবল বর্ষণ ও মশার কামড়ে সুলতানের সেনাবাহিনী ও ঘোড়াগুলি অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং তিনি দিল্লি ফিরে যেতে বাধ্য হন। ইলিয়াস শাহের রাজত্বকালে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যের উন্নতির জন্যও তাঁর শাসনকাল স্মরণীয়।
তাঁর পুত্র সিকন্দর শাহ (১৩৫৭-৮৯ খ্রিঃ) পিতার মতই বিচক্ষণ, বীর যোদ্ধা ও সুশাসক ছিলেন। ১৩৫৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীশ্বর ফিরোজ তুঘলক পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সিকন্দর শাহ একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। বেশ কয়েকমাস অবরোধের পরেও ফিরোজ তুঘলক দুর্গ অধিকারে ব্যর্থ হন এবং দু'পক্ষের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধি দ্বারা দিল্লি কার্যত বাংলার স্বাধীনতা মেনে নেয় এবং এর পরে দুইশ' বছর ধরে আফগানদের অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ আর কখনও দিল্লি কর্তৃক আক্রান্ত হয়নি। তিনি শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর আমলে বাংলায় বহু মসজিদ ও অন্যান্য ইমারত তৈরি হয়। পাণ্ডুয়ার বিখ্যাত আদিনা মসজিদ ও কোতোয়ালি দরওয়াজা তাঁর আমলে তৈরি হয়। তাঁর রাজত্বকাল শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ হিসেবে চিহ্নিত।
তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন আজম (১৩৮৯-১৪০৯ খ্রি:) দক্ষ ও দয়ালু শাসক ছিলেন। সম্ভবত তিনি কামরূপ ও কুচবিহার রাজ্যের কিছু অংশ ক্রয় করেন। তিনি চিনদেশে মিঙ বংশীয় সম্রাট ইয়ং-লো'-র দরবারে দূত পাঠান। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে জনৈক চৈনিক দ্রুত তাঁর রাজ্যে আসেন এবং সেই দূতের সঙ্গে মা-হুয়ান নামে জনৈক পণ্ডিতও আসেন। মা হুয়ানের রচনায় বাংলার ঐশ্বর্য ও বাঙালির বদান্যতার সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফেজ-এর সঙ্গে তিনি পত্রালাপ করতেন।
গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর একে একে তিনজন দুর্বল উত্তরাধিকারী সিংহাসনে বসেন। এ সময় রাজা গণেশ (১৪১৫-১৮ খ্রিঃ) নামে ভাতুড়িয়া ও দিনাজপুরের জনৈক ব্রাহ্মণ জমিদার প্রভূত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে সিংহাসন দখল করেন। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তিনি দু'জন নামসর্বস্ব সুলতানের প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য শাসন করতেন। তাঁর উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর পুত্র যদু। তিনি ইসলামধর্ম গ্রহণ করেন এবং জালালউদ্দিন (১৪১৮-৩১ খ্রিঃ) নামে পরিচিত হন।পূর্ববঙ্গ ও চট্টগ্রাম-সহ সমগ্র বাংলাদেশ তাঁর অধীনস্থ ছিল। তাঁর সুদক্ষ শাসনে বাংলাদেশ সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। তাঁর পুত্র শামসউদ্দিন আহম্মদ (১৪৩১-৪২ খ্রিঃ) প্রবল অত্যাচারী ছিলেন। তাঁর কুশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে আমির-ওমরাহগণ তাঁকে হত্যা করে নাসিরউদ্দিন মামুদ নামে ইলিয়াস শাহের এক বংশধরকে সিংহাসনে বসান।
নাসিরুদ্দিন মামুদ (১৪৪২-৫৯ খ্রিঃ) -এর রাজত্বকাল প্রজাদের কাছে সুখ ও সমৃদ্ধির কাল হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর আমলে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে বাংলার সীমানা সংকুচিত হয়, কারণ উড়িষ্যার রাজা কপিলেন্দ্রদেব ও আরাকান রাজ বাংলার দুই অংশের কিছু স্থান দখল করে নেন। পরবর্তী সুলতান রুকনউদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫ ৭৪ খ্রিঃ) কামরূপ ও উড়িষ্যার বিরুদ্ধে সাফল্য লাভ করে কয়েকটি অঞ্চল দখল করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বারবকের পর শামউদ্দিন ইউসুফ (১৪৭৪-৮১ খ্রিঃ) ও জালালউদ্দিন ফতে শাহ (১৪৮৭ খ্রিঃ) সিংহাসনে বসেন। ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দে জনৈক হাবসি ক্রীতদাস জালালউদ্দিনকে হত্যা করলে ইলিয়াস শাহি বংশের অবসান ঘটে।
তথ্যসূত্রঃ
(১) স্বদেশ পরিচয়, জীবন মুখোপাধ্যায়।
(২) History of bengal, Vol-2, Jadunath Sarkar
(৩) Wikipedia