#বাংলায়_মুসলিম_শাসন
পর্ব নম্বর- ০৯ঃ
বাংলায় আফগান শাসনঃ
১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় হোসেন শাহী রাজবংশের পতন ঘটে এবং শুরু হয় আফগান শাসন। প্রাথমিকভাবে এই শাসন মাত্র ছয় মাস টিকলেও পরবর্তীতে ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে প্রায় ৩৮ বছর এই আফগান শাসন বলবৎ থাকে।
শেরখান শূর ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে হোসেন শাহী বংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে বাংলা অধিকার করেন এবং সেখানে শূর বংশীয় আফগান শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মাহমুদ শাহের সাহায্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে বিনা বাধায় গৌড় অধিকার করেন এবং সেখানে তিনি প্রায় আট মাস অবস্থান করেন। দিল্লির সিংহাসন নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী ষড়যন্ত্র শুরু হলে হুমায়ুন বাংলা ছেড়ে দিল্লির অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে শেরখান অতর্কিতে আক্রমণ করে হুমায়ুনকে পরাজিত করেন। অতঃপর তিনি বাংলার শাসনকর্তা জাহাঙ্গীর কুলীকে হত্যা করে গৌড় অধিকার করেন (অক্টোবর, ১৫৩৯ খ্রি.)। এইভাবে বাংলা শূর সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। বাংলা তখন শূর সাম্রাজ্যের গভর্নর দ্বারা পরিচালিত হতো।
শূর শাসনের অধীনস্থ বাংলার গভর্নরদের নাম সমূহঃ
খিজির খান (১৫৩৯-৪১)
কাজী ফজিলত (১৫৪১-৪৫)
মুহাম্মদ খান শূর (১৫৪৫-৫৪)
সাম্রাজ্য গড়ার কাজে বাংলার গুরুত্বকে যথার্থভাবে অনুধাবন করে শেরশাহ বাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রতি মনোনিবেশ করেন। তিনি প্রতারণামূলক কার্যকলাপের জন্য প্রথম গভর্নর খিজির খানকে চাকরিচ্যুত করেন (খিজির খান নিজে বাংলার স্বাধীন রাজা হতে চেয়েছিলেন)এবং চট্টগ্রামসহ বাংলাকে ছোট ছোট কয়েকটি ইউনিটে বিভক্ত করে প্রত্যেক ইউনিটকে এক একজন মুক্তার অধীনে ন্যস্ত করেন। তিনি সকল মুক্তারদের ওপর প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজী ফজীলতকে নিয়োগ করেন। শেরশাহের পরিকল্পনা খুবই ফলপ্রসূ হয় এবং আফগানরা বাংলায় এমন স্থায়ীভাবে নিবাসিত হয় যে, তারা বাংলার আবহাওয়া ও সংস্কৃতির সাথে একান্তভাবে মিশে যায়।
শেরশাহের অতর্কিত মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ (১৫৪৫-৫৩ খ্রি.) বাংলার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন। তিনি আবার পূর্বের মত প্রাদেশিক শাসন গঠন করেন এবং তিনি তাঁর আত্মীয় মুহাম্মদ খান শূরকে বাংলার গভর্নর এবং সোলায়মান কররানীকে বিহারের গভর্নর নিযুক্ত করেন। এই সময়ে বাংলার ভাটি এলাকায় (ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরা সিলেটের নিম্নাঞ্চল) সোলায়মান খান নামক এক ব্যক্তি বিদ্রোহ করেন। যতদূর জানা যায় সোলায়মান খান ছিলেন মূলত একজন রাজপুত, নাম কালিদাস গজদানী । কালিদাস গজদানীর কোন এক পূর্ব-পুরুষ বাংলায় আসেন এবং সরকারের চাকুরি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে কালিদাস গজদানী উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত হন এবং সুলতানের মেয়েকে বিয়ে করেন। এই সূত্রে তিনি নিজেকে পরালোকগত সুলতান গিয়াস-উদ-দীন মাহমুদের (যিনি হোসেন শাহী বংশের শেষ রাজা ছিলেন) বৈধ উত্তরাধিকারী মনে করেন। তাই তিনি ইসলাম শাহ শূরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ইসলাম শাহ তাজ খান ও দরিয়া খান নামক দুই সেনাপতিকে সোলায়মানের বিরুদ্ধে পাঠান, সোলায়মান পরাজিত ও নিহত হন, তাঁর দুই ছেলে ঈসা ও ইসমাইলকে নির্বাসন দেয়া হয়। এই ঈসাই পরবর্তীকালের ঈসা খান মসনদ-ই-আলী, বারভূঞার নেতা হয়েছিল।
ইসলাম শাহের মৃত্যুর পরে বাংলার গবর্নর মুহাম্মদ খান শূর, শামস-উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ গাজী উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। এদিকে দিল্লীর সিংহাসন নিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অমাত্যেরা ইসলাম শাহ শূরের ছেলে ফীরুজকে সিংহাসনে বসায়, কিন্তু ইসলাম শাহের শ্যালক মুবারিজ খান ফীরুজকে হত্যা করে মুহাম্মদ শাহ আদিল (আদিল শাহ) উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তিনি আফগানদের দমন করতে পারলেন না, রাজদরবারেই খুনাখুনি হয়ে যায়।
সে যাই হোক, এই সুযোগে শামস-উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ সসৈন্যে দিল্লীর দিকে অগ্রসর হন, পথে ছপপরঘাটা নামক স্থানে দিল্লীর সৈন্যদের (আদিল শাহ এর সৈন্য) সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। তিনি পরাজিত হয়ে নিহত হন।
শামস-উদ-দীন মুহাম্মদ শাহ নিহত হলে অমাত্যেরা যুদ্ধক্ষেত্রের নিকটেই তাঁর পুত্র গিয়াস-উদ-দীন কে বাহাদুর উপাধি দিয়ে সিংহাসনে বসান। বাহাদুর শাহ প্রথমে গৌড়ে তাঁর ক্ষমতা সুদৃঢ় করেন এবং তারপর পিতার হত্যাকারী কে শাস্তি দেওয়ার জন্য অগ্রসর হন। মুহাম্মদ শাহ আদিলের (আদিল শাহ) বিরুদ্ধে বিদ্রোহী সেনানায়ক তাজ খান কররানী, বাহাদুর শাহের সঙ্গে যোগ দেন। সুরুজগড়ের অদূরে ফতেহপুর নামক স্থানে উভয় পক্ষের যুদ্ধ হয় এবং মুহাম্মদ শাহ আদিল নিহত হন। তাজখান কররানীকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে বাহাদুর শাহ নিজে গৌড়ে ফিরে আসেন।
এদিকে দিল্লীতে আবার ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। হুমায়ুন দিল্লী অধিকার করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পরে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আকবর দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। বাংলার সুলতান বাহাদুর শাহ মুঘলদের বিতাড়ন করার উদ্দেশ্যে ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হন। কিন্তু জৌনপুরে মুঘল সেনাপতি খান ই জামানের নিকট পরাজিত হয়ে ফিরে আসেন। বাহাদুর শাহের সময়কালে আব্দুর রহমান নামক এক পণ্ডিত ব্যক্তি মখজন-ই-গনজরাজ নামক ফারসি ভাষায় একখানি পুস্তক লেখেন। এর বিষয়বস্তু ছিল তসওওফ বা সূফীতত্ত্ব।
১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জালাল শাহ ক্ষমতা লাভ করেন এবং ১৫৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। জালাল শাহকে হত্যা করে গিয়াসউদ্দীন নামক জনৈক আফগান ক্ষমতা জবরদখল করেন।
কিন্তু কয়েকদিন পরেই, তাজখান কররানী (যাঁকে বাহাদুর শাহ বিহারের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন) এই জবরদখলকারী গিয়াসউদ্দীনকে হত্যা করে বাংলায় কররানী শাসনের সুত্রপাত করেন। পরবর্তী পর্বে আমরা এই কাররানী শাসনের ইতিহাস জানবো ইনশাআল্লাহ।
তথ্যসূত্রঃ
(১) "আফগান শাসন", Banglapedia.
(২) "Bengal Sultanate", Wikipedia.
(৩) বাংলার ইতিহাস, আব্দুল করিম।

