বাংলা সালতানাত (১৩৫২-১৫৭৬)
প্রতিষ্ঠাতাঃ শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ (ইলিয়াস শাহী রাজবংশ)
শাসনকাল- ১৩৫২-১৩৫৯
শ্রেষ্ঠ শাসকঃ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (হোসেন শাহী রাজবংশ)
সর্বষ শাসকঃ দাঊদ খান কররানী (১৫৭২-১৫৭৬)
একমাত্র হিন্দু শাসকঃ রাজা গণেশ
প্রথম কাঠমুণ্ডু অভিযান পরিচালনা করেন - সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ
আরাকান কে বাংলা সালতানাতের করদ রাজ্যে পরিণত করেন- সুলতান জালালউদ্দিন মুহম্মদ শাহ
বাংলা সালতানাতের পতনঃ রাজমহলের যুদ্ধ, ১৫৭৬, মুঘল বাহিনী কর্তৃক পরাজিত
রাজবংশসমূহ :- (১) ইলিয়াস শাহী রাজবংশ,
(২) রাজা গণেশের পরিবার
(৩) হাবশি রাজবংশ
(৪) হোসেন শাহী রাজবংশ
(৫) বলবন রাজবংশ
(৬) কররানী রাজবংশ
বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধঃ ১৫৭৬ সাল থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে সুবাদার ইসলাম খান বারো ভূঁইয়া দের নেতা মুসা খান কে পরাজিত করেন এবং বাংলায় পুরোপুরিভাবে মুঘল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে স্থানান্তরিত করে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকা কে 'জাহাঙ্গীরনগর' নাম করণ করেন।
১২০৪ সালে দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনানায়ক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি সেন বাংলায় রাজত্বকারী অত্যাচারী চরমপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজবংশের রাজা লক্ষণ সেন কে পরাজিত করে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত করেন এবং বাংলা দিল্লি সালতানাতের প্রদেশে পরিণত হয়। ১২০৪ সাল থেকে ১৩৩৮ সাল পর্যন্ত বাংলার শাসকেরা দিল্লির সুলতানের অধীনস্থ গভর্নর হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। ১৩৩৮ সালে সর্বপ্রথম ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ দিল্লি থেকে পৃথক হয়ে নিজেকে বাংলার স্বাধীন শাসক ঘোষণা করেন এবং এরপর থেকে বাংলা দিল্লি সালতানাত থেকে পৃথক ও স্বাধীন ছিলো।।
১৩৫২ সালে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ দক্ষিণবঙ্গ (রাজধানী সাতগাঁও) , উত্তর বঙ্গ (লখনৌতি) ও পূর্ব বঙ্গ (সোনারগাঁও) এই ৩ প্রদেশ কে একত্রিত করে সমগ্র বাংলাকে একীভূত করে সার্বভৌম বাংলা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজেকে শাহী বাংলার প্রথম সম্রাট ঘোষণা করেন। তিনি 'শাহ-ই-বাঙ্গালাহ্' (বাংলার শাহ) ও 'শাহ-ই-বাঙ্গালি' (বাঙালির শাহ) উপাধি ধারণ করেন এবং এই অঞ্চলের অধিবাসীদের 'বাঙালি' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি হলেন অখণ্ড বাংলার প্রথম স্বাধীন সম্রাট। সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের শাসনামলে তিনিই প্রথম শাসক হিসেবে নেপালে অভিযান চালান এবং কাঠমুন্ডু উপত্যকাকে বাংলা সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করেন।
বাংলা সালতানাতের অফিশিয়াল ভাষা ছিলো বাংলা ও ফার্সী।
মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ সময় বাংলা সাহিত্য চর্চা বিশেষ উৎকর্ষ অর্জন করে। বাংলার সুলতানেরা দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাকে বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে পৃথক রাখেন।
১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের বাহিনীর হাতে সুলতান দাঊদ খান কররানীর পরাজয়ের ফলে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের প্রদেশে পরিণত হয়।
কিন্তু, ১৫৭৬ সালে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও প্রায় সমগ্র বাংলাই সেসময় স্বাধীন ছিলো। বাংলা সালতানাতের পতন ঘটলেও বাংলার বড় বড় জমিদাররা নিজেদের রাজ্যে স্বাধীন থাকেন এবং মুঘল সাম্রাজ্য থেকে পৃথক হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করেন। বারো ভূঁইয়ারা একজোট হয়ে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন। এভাবে বাংলাকে মুঘল অধীনতা থেকে মুক্ত রাখেন বারো ভূঁইয়ারা। বারো ভূঁইয়াদের প্রধান নেতা ছিলেন ঈসা খাঁ। ভাটি অঞ্চলে মোঘল দূর্গে হানা দিয়ে বাংলার মাটিতে মুঘল বাহিনীর পতাকা নামিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন ঈসা খাঁ।
অবশেষে, ১৬১০ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে মুঘল সমরনায়ক ইসলাম খানের নেতৃত্বাধীন মুঘল বাহিনীর হাতে মুসা খাঁর নেতৃত্বাধীন বারো ভূঁইয়ারা পরাজিত হয় এবং বাংলা চূড়ান্তভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রদেশে (সুবা) পরিণত হয়।।
চিত্র- বাংলা সালতানাতের মানচিত্র। সাদা অংশ সরাসরি বাংলা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ; সোনালি চিহ্নিত অংশসমূহ বাংলা সালতানাতের করদ রাজ্য (ভাসাল স্টেট)
কাঠমুণ্ডু উপত্যকা থেকে আরাকান পর্যন্ত ছিলো বাংলা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি
