মাওলানা ইসমাইল রেহান হাফিঃ
চুক্তির অন্তর্ভুক্ত বিষয় সমূহ মোস্তফা কামালের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। যেগুলো রঙঢং মাখিয়ে প্রচার করে সে পরিস্থিতির মোড় পাল্টে দেয়। অবশ্য এতে কোন সন্দেহ নেই যে , ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাই চুক্তিপত্রের নকল কপি তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। ফলে কিছুক্ষণ পূর্বে অবধি যে জাতীয় প্রশস্ততা খলিফার সঙ্গী হয়েছিল, তা এখন সম্পূর্ণ খলিফার বিরুদ্ধে চলে গেল । এবং আঙ্কারা হুকুমতের সাহায্যকারী বনে গেল। ফলে আঙ্কারায় খলিফার অনুগত বাহিনীর হামলা ব্যর্থ হয়ে যায়।
এখন আমাদের এই বিষয়টা একটু চিন্তা করতে হবে যে , যদি আসলেই খলিফা ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে থাকতো এবং মোস্তফা কামাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রকৃত বিরোধী হতো তবে ব্রিটেন কেন আঙ্কারার স্থলে ইস্তাম্বুলের উপর দখল নেওয়া আবশ্যক মনে করল? মোস্তফা কামালকে কেন তারা স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিল? মোস্তফা কামাল যদি ইংরেজদের দাবার গুটি নাই হতো , তাহলে সে কেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোন কর্মতৎপরতা করেনি !? আঙ্কারাবাহিনী ফ্রান্স, ইতালি এবং ইউনানের বিরুদ্ধে অবশ্য কাতারবন্দী হয়েছিল যার দ্বারা মোস্তফা কামালের দেশপ্রেম, বীরত্ব ও সাহসিকতার আলোচনা হয় এবং জনসাধারণের মাঝে ভরসা অর্জন হয়। কিন্তু সে বৃটেনের সাথে যুদ্ধ করার কোন চেষ্টাই করেনি। যখন তুর্কিদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ইস্তাম্বুলে শুধু ব্রিটিশ ফৌজ অবস্থান করেছিল , মোস্তফা কামাল সেখানে হামলা করে ইংরেজদের থেকে তা কেন মুক্ত করে নি ? আর যদি সে সালতানাতে উসমানের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীই হত, তবে খলিফা কে ব্রিটিশদের প্রভাব থেকে বের করাও তারই জিম্মাদারী ছিল । কিন্তু সে এসবের কিছুই করেনি।
প্রশ্ন হল কেন করেনি ? এ প্রশ্নও উঠে যে, যদি মিত্রশক্তি চাইতো কামাল থেকে মুক্তি পাওয়া তাদের জন্য একদমই কঠিন ছিল না। তারা তার মাথা শুরুতেই গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা কেন করেনি? বা এর জন্য কর্মতৎপরতা কেন শুরু করেনি ? এসবের দ্বারা পরিষ্কার বুঝে আসে যে, বিশ্ব কুফফার শক্তি কামালের হাতে খেলাফত ধ্বংস করার জন্য তাকে একজন চিত্তাকর্ষক নেতার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল । মিত্রবাহিনী বিশেষ করে ব্রিটেন গোটা পরিস্থিতি নিজেদের পক্ষে রাখতে সফল হয়েছিল । কামালের গ্রহণযোগ্যতা এবং উত্থানে তাদের বিন্দুমাত্র কোন ক্ষতি হয় নাই। বরং তাদের উদ্দেশ্য অর্জনের পথ সহজ হয়ে যায়। পরিশেষে ব্রিটেন ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুআহাদায়ে সেওরের উপর নজরে সানির জন্য লন্ডনে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করে এবং ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারা উভয় হুকুমতের প্রতিনিধিদের তলব করে। তাতে সমস্ত বিষয় মোস্তফা কামালের উজিরের সাথে সিদ্ধান্ত করা হয় কিন্তু পৃথিবীবাসী জানত যে উসমানীয়রা বিশ্বযুদ্ধের একটা দল আর মিত্র বাহিনীর সাথে সন্ধির বিষয়সমূহ সিদ্ধান্ত করাও তাদেরই অধিকার । ওই কনফারেন্সে মোস্তফা কামাল ফ্রান্সের অধিকারে উত্তর শাম ছেড়ে দেওয়ার উপর রাজি হয়ে যায় ,বিনিময়ে ফ্রান্স আঙ্কারা হুকুমতকে মেনে নেয়। পূর্ব সীমান্তবর্তী এলাকা গুলির উপর রুশদের কর্তৃত্ব মেনে নেয় আর ফলশ্রুতিতে তারা তুর্কি নয়া হুকুমতকে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এভাবেই মোস্তফা কামাল একজন শাসকের অবস্থা অর্জন করে।বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে এ ব্যাপার গুলো ফয়সালা হওয়ার পর শুধু ইউনান এর সাথে আজমির নিয়ে সমস্যা থেকে যায়। এই ইউরোপীয় রাষ্ট্রের সাথে মোস্তফা কামাল আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার সিদ্ধান্ত না নিয়ে শক্তির মাধ্যমে ফয়সালা করার ইচ্ছা করেন। যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে , এটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। কেননা ইউনান একটি স্বল্প শক্তিধর রাষ্ট্র ছিল। যারা বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর সাহায্যেই কিছু সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। এখন আমরা ইউনানের সাথে মোস্তফা কামালের যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে জানব, যার উপর ভিত্তি করে জাতির এই গাদ্দারকে এক মহানসেনানায়ক, বিজয়ী সিপাহসালার এবং জাতির মুক্তিদূত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এবং ইহুদি প্রচার মাধ্যমগুলো এই প্রদর্শনীর যুদ্ধের মাঝে মোস্তফা কামাল পাশার বীরত্ব ও সাহসিকতার আকৃতি এমন জোরালো ভাবে তুলে ধরে যে , মুসলিম জনসাধারণ এই নতুন চেহারা কে নিজেদের মুক্তিদূত মনে করতে থাকে। লন্ডন এবং আমেরিকার সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ পত্রপত্রিকাসহ সর্বত্র "গাজী মোস্তফা" এর ডঙ্কা বাজতে থাকে। আরবের কবি আহমদ শাওকী নিজের শুহরায়ে আ'ফাক ক্বাসিদায় , মোস্তফা কামালকে খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সমকক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পুরো দুনিয়ার মুসলমান দেড় দুই শতাব্দী যাবত পরাজয়ের পর পরাজয় দেখছিল এবং এই সময় আফগানিস্তান এবং তুরস্ক ছাড়া পৃথিবীতে স্বাধীন কোন ইসলামী রাষ্ট্র ছিল না। গোলামীর জিঞ্জিরে লেপ্টে যাওয়া সকল মুসলমান মোস্তফা কামাল পাশাকে এমন বাহাদুর সেনানায়ক হিসেবে ভাবতে লাগে যে , খেলাফতের শান-শওকত দ্বিতীয়বার কায়েম করার চেষ্টায় লিপ্ত। আর খলিফা ওয়াহিদুদ্দিনকে এক ভীরু ও অযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে মনে করতে থাকে। কিন্তু নিজেকে "আতাতুর্ক" উপাধিতে ভূষিত কারী স্বাধীনতার এই মহানায়ক এর আমল নামায় এমন একটি কাজ ও এমন নেই , যার ওপর ইসলামী ইতিহাস গর্ব করতে পারে। তাকে যেখানে পাঠানো হতো সেখানেই সে কোন না কোন গোলমাল সৃষ্টি করে ফিরত। আর এটাতো পৃথক বিষয় যে , ওইসব বাস্তবতাকে ইহুদিলবী ঢেকে দেয় এবং কামালের পিছুটান ও পলায়নপরতাকে অতুলনীয় নেতৃত্ব , বীরত্ব ও সাহসিকতার চমকদার মোড়ক লাগিয়ে দেয়। যে লোক মোস্তফা মোস্তফা কামালের অন্য কোনোও গুণের প্রবক্তা নয় সেও একথা মনে করতো যে, কমপক্ষে ইউনানের মোকাবেলায় সে বেশ জবরদস্ত ইস্তিকামাত দেখিয়েছে এবং তুর্কিদের শত্রুর হাতে ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করেছে । এর কারণ এই যে , ইউনানের সাথে যুদ্ধের অবস্থা অধিকাংশ ইতিহাসের পাতায় সংক্ষিপ্ত আকারে পাওয়া যায় । শুরুর দিকেই তারা জেনে বুঝে এমনটি করেছে , যাতে করে বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়। শুধু এতোটুকু স্পষ্ট যে , যুদ্ধ হয়েছে এবং ইউনান পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছে ব্যস। যার বিজয়ের মুকুট মোস্তফা কামালের মাথায়।
কতক তার বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। সুতরাং একটু দেখে নেয়া যাক ওই যুদ্ধে কামালের কতটুকু বাহাদুরি ছিল এবং ইউনানকে কোথায় কোথায় পরাজিত করে পলায়ন করতে বাধ্য করা হয়। ১৯২১ সালের বসন্তের মৌসুমে মোস্তফা কামাল তুর্কি বাহিনীগুলোকে রাশিয়ান অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে রণাঙ্গণে প্রেরণ করে। কিন্তু তুর্কি বাহিনী রণাঙ্গণে পৌঁছার পূর্বেই ভীত করার জন্য চোরাগুপ্তা হামলা শুরু করে। ইউনানের বিশ্বাস ছিল যে , অচিরেই ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি তাদের সাহায্যে এসে যাবে এবং তারা যুদ্ধে জিতে যাবে । কেননা একটা দীর্ঘ সময় ধরে এসব শক্তিগুলোর সাহায্যে ইউনান উসমানীয়দের বিরুদ্ধে নানা ধরনের চক্রান্ত করে আসছিল। কিন্তু বতাদের মিত্রশক্তি ব্রিটেন এবং ইহুদি লিডারদের ইচ্ছা অন্য কিছু ছিল। তাই ব্রিটেন স্পষ্ট ঘোষণা দেয় যে, তারা এবং তাদের মিত্র বাহিনী এই যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করবে না। ৬ই মার্চ ১৯২১ সালে ইউনান হামলা শুরু করে এবং তুর্কি জেনারেল ইসমত ইনুনু কে পিছু হটিয়ে দেয়। অতঃপর ইউনান সামনে এগিয়ে উসমানীয়দের প্রথম রাজধানী বুরসা পর্যন্ত পৌঁছে সেখান থেকে ইস্তাম্বুল হামলার প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। কিন্তু বৃটিশ বাহিনী তাদের পথরোধ করে দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে ইউনান এখান থেকে প্রত্যাবর্তন করে " কোতাহিয়া"পৌঁছে , যেখানে ইসমত ইনুনু দ্বিতীয়বার নিজ বাহিনী বিন্যস্ত করছিল। ইউনান দক্ষিণে "কারাহিসার" এর ওপর দখল নিয়ে উত্তর দিকে মার্চ করে। এদিকে মোস্তফা কামাল নিজ কমান্ডে আঙ্কারা থেকে বাহিনী নিয়ে এই রণাঙ্গণে এসে পৌঁছে । কিন্তু ইউনানের উপর হামলার বদলে সে বাহিনীকে যুদ্ধ বন্ধ করে পূর্ব দিকে এগিয়ে যাওয়ার হুকুম দেয় । এই পিছুটানের কারণে তুর্কিদের কঠিন মূল্য পরিশোধ করতে হবে জেনেও সে এসবের তোয়াক্কা করে না করে বাহিনীকে সাকারিয়া নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে আত্মরক্ষা বুহ্য রচনার হুকুম দেয়। সেখানে তুর্কিদের সমস্ত সৈন্যবাহিনী একত্রিত হয় যার সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার।
আল ইমারাহ অনুবাদ ঘর
অচিরেই শেষ পর্ব আসছে--------