#বাংলায়_মুসলিম_শাসন
পর্ব নম্বর-৫ঃ
হোসেন শাহী রাজবংশ (১)____________
শাসকদের লিস্টঃ
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)
নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ (১৫১৯-১৫৩৩)
দ্বিতীয় আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৫৩৩)
গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩-১৫৩৮)
সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯)--
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ মধ্যযুগের বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক জনপ্রিয় শাসক ছিলেন। তাঁর সিংহাসন আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল যুগের সূত্রপাত হয়। ঐতিহাসিক বি. এন. রায় তাঁর রাজত্বকালকে "মধ্যযুগের বাংলায় সর্বাপেক্ষা গৌরবজনক অধ্যায়" বলে চিহ্নিত করেছেন। সিংহাসনে আরোহণের পর প্রথমেই তিনি হাবসিদের বিতাড়িত করে বাংলায় শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। তিনি কামতাপুর (কোচবিহার) ও কামরূপ জয় করেন। উড়িষ্যা, ত্রিপুরা ও আরাকানের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযান পাঠান, কিন্তু এই সব অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বাংলার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিনা, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। বর্তমান বিহারের অনেকটাই যে তিনি জয় করেছিলেন সে সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই।
তিনি উদার ও সুদক্ষ শাসক ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক স্থাপিত হয়। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গুণবান ব্যক্তিদের তিনি উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত করতেন। শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও তিনি উল্লেখযোগ্য। বহু হিন্দু কবি ও সাহিত্যিক তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেন। তাঁর উদ্যোগে বহু মসজিদ ও হাসপাতাল নির্মিত হয়। তাঁর আমলেই চৈতন্যদেব এর আবির্ভাব ঘটে এবং হিন্দু-মুসলিম ভাবাদর্শের সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর উদারতায় মুগ্ধ হিন্দুগণ তাঁকে 'নৃপতি-তিলক', 'জগৎ-ভূষণ' প্রভৃতি অভিধায় ভূষিত করে। তাঁর পরধর্মসহিষ্ণুতার জন্য অনেকে তাঁকে 'বাংলার আকবর' বলে অভিহিত করেন। ঐতিহাসিক ডঃ নুরুল হাসান বলেন; “হোসেন শাহের শান্তিপূর্ণ ও উদারপন্থী শাসনে মধ্যযুগের বাংলার জনসাধারণের সৃজনী প্রতিভা সর্বোচ্চ সীমায় আরোহণ করে। স্যার যদুনাথ সরকার-এর মতে, তিনি ছিলেন প্রশ্নাতীতভাবে মধ্যযুগের বাংলার, মহত্তম না হলেও, সর্বোত্তম শাসক।
নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ (১৫১৯-১৫৩৩)--
নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহ সৈয়দদের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ছিলেন বাংলা সালতানাতের হোসেন শাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। নুসরাত শাহ ইব্রাহিম লোদির এক কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন, যিনি প্রতিবেশী দিল্লি সালতানাতের শাসক ছিলেন।
১৫১৯ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর, নুসরাত শাহ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তাঁর পিতার নীতি অনুসরণ করে, নুসরাত শাহ তাঁর শাসনামলের প্রথম দিকে তিনি সুলতানি অঞ্চল বিস্তৃত করেন এবং খলিফাতাবাদ (বর্তমানে বাগেরহাট, বাংলাদেশ) একটি গুরুত্বপূর্ণ টাকশাল শহর হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাবরের ভারত আক্রমণের পর, মাহমুদ লোদি এবং তাঁর আফগান মিত্ররা নিরাপত্তার জন্য বাংলায় পালিয়ে যায়। ১৫২৭ সালে, বাবর মুঘল রাজত্বের প্রতি নুসরাত শাহের মনোভাব অনুমান করার জন্য এবং বাংলা সম্পর্কিত কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলায় একজন দূত পাঠান। নুসরাত শাহ সাড়া না দিয়ে দূতকে কারারুদ্ধ করেন। যাইহোক, নুসরাত শাহ পরে শান্তি চুক্তি করেন এবং বাবরকে উপহার পাঠানোর জন্য দূতকে মুক্তি দেন। বাবর উত্তরে খুশি হন ও নুসরাতকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম মহান শাসক হিসাবে বর্ণনা করেন, বাঙ্গালী সৈন্যদের তাদের বন্দুক ও নৌবাহিনীর জন্য প্রশংসা করেন এবং তাদের নেতার প্রতি বাঙালিদের আনুগত্যকে স্বীকৃতি দেন।
পরবর্তীকালে আফগানদের দ্বারা পীড়িত হওয়ার পর, মুঘলরা তাদের এবং তাদের বাঙালি মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পথে আফগানদের পরাজিত করার চেষ্টা করে মুঘলরা বাংলার দিকে অগ্রসর হয়। বাবর বক্সারে থামার আগে তিরহুতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ঘাঘরার তীরে ক্যাম্প করা তাদের সৈন্যদের বরখাস্ত করার জন্য বাংলাকে অনুরোধ করেছিলেন। নুসরাত শাহের প্রত্যাখ্যান ঘাঘরা যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দেয়। ১৫২৯ সালের ৬ মে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যেখানে মুঘলরা আফগান ও বাঙালিদের সাথে যুদ্ধ করেছিল। মুঘল সাম্রাজ্য বিজয়ী হয়েছিল, এবং তাদের অঞ্চল বিহারের ঘাঘরার পূর্ব তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েগিয়েছিল যদিও তারা বাংলায় প্রবেশ করতে পারেনি। নুসরাত শাহ একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলার মর্যাদা বজায় রেখেছিলেন।
নুসরাত শাহ একজন যোগ্য শাসক ছিলেন। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পূর্ণ রাজ্য অক্ষুন্ন রাখেন, বরং কোন কোন সীমান্তে রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন। তিনি একজন উচ্চস্তরের কূটনীতিক-ছিলেন। প্রধানত কূটনীতির দ্বারা তিনি বাবরের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ এড়াতে সক্ষম হন। তিনি আফগানদের গোপনে সমর্থন দেন, এবং বাবরের দূতকে দীর্ঘদিন উত্তর না দিয়ে বাবরের গতিবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। অবশেষে খরিদ নামক স্থানের অধিকার নিয়ে বাবরের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়, বাবরনামাই এই বিষয়ে এক মাত্র সূত্র। এই সূত্রে নুসরাত শাহ পরাজিত হন কিন্তু বর্ষাকাল এসে গেলে বাবর নুসরাতের সঙ্গে চুক্তি করে ফিরে যান। সে যাই হোক নুসরাত শাহ আফগানদের পক্ষে বাবরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে নুসরাত শাহের ক্ষতি হতে পারত। নুসরাত শাহের বলিষ্ঠ কূটনীতি-ই তাঁকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করে।
নুসরাত শাহ একজন উদার এবং দয়ালু লোক ছিলেন। তিনি ভাইদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। সমসাময়িক কালে এইরূপ মহানুভবতা দেখা যায় না। নুসরাত শাহ একজন নিষ্ঠাবান সুলতান ছিলেন। তিনি অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন। তাঁর নির্মিত বড় সোনা মসজিদ, কদম রসূল ভবন ইত্যাদি স্থাপত্য শিল্পে অপূর্ব নিদর্শন। কদম রসূল ভবনে হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্র পায়ের প্রতিকৃতি সংরক্ষিত আছে। তাঁর আদেশে আহমদ মজল্লদ খান বিন মাহমুদ (মাহমুদের পুত্র) নামক একজন ফারসি ভাষার পণ্ডিত 'ইসকান্দার নামা' নামক একখানি পুস্তক অনুলিখন করেন। লেখক নিশ্চয়ই তাঁর পৃষ্ঠপোষণ লাভ করেন। নুসরাত শাহ বাংলা সাহিত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং কবিদের উৎসাহিত করেন। শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বে তৎকালীন সুলতান হোসেন শাহের সঙ্গে সঙ্গে রাজপুত্র নুসরাত শাহেরও প্রশস্তি করেন। যুবরাজের নামের সঙ্গে শাহ উপাধি দিয়ে বলেন, “পুত্র সম রক্ষা করে সকল পরজা"। কবি শেখর (বা কবিরঞ্জন বা বিদ্যাপতি) নামক একজন পদকর্তার ভণিতায়ও নুসরাত শাহের নাম পাওয়া যায়। অতএব নুসরাত শাহ যেমন সাহসী ও উদার নরপতি ছিলেন তেমনি শিল্প সাহিত্যেও তাঁর অনুরাগ ছিল এবং ফারসি ও বাংলা সাহিত্যের পোষকতা করেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি সুশাসনের উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখেন।
নুসরাত শাহ ১৩ বৎসর রাজত্ব করে ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেন। কথিত আছে যে, গৌড়ের একনাকা নামক স্থানে পিতার সমাধি থেকে ফিরবার পথে তিনি আততায়ী কর্তৃক নিহত হন।
দ্বিতীয় আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (১৫৩৩)--
নুসরাত শাহের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র সুলতান আলাউদ্দিন, ফিরোজ শাহ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন। পিতা ও পিতামহের মতো আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহও বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর আদেশে দ্বিজ শ্রীধর 'বিদ্যাসুন্দর', বা 'কালিকা মঙ্গল' কাব্য রচনা করেন। তিনি যুবরাজ থাকাকালে কবিকে কাব্য রচনার আদেশ দেন। এই সুলতানের মাত্র দু'খানি শিলালিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, দু'খানিই একই বৎসর বর্ধমানের কালনায়, উজীর ও সেনাপতি উলুঘ মসনদ খান উৎকীর্ণ করেন। তাঁর মুদ্রা এবং শিলালিপি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, তিনি মাত্র বৎসর খানিক (নয় দশ মাস) রাজত্ব করেন। তাঁর পিতৃব্য এবং পরবর্তী সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ তাঁকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন।
হোসেন শাহী বংশের ইতিহাস এর প্রথম পর্ব এইখানে শেষ করলাম। আরো কিছু তথ্য বাকি রয়ে গেল সেটা দ্বিতীয় পর্বে ইনশাআল্লাহ পোস্ট করা হবে কারণ এখানে আরো লিখলে পোস্টটি দীর্ঘায়িত হবে এবং আপনারাও পড়ার ধৈর্য হারাবেন তাই সঙ্গে যুক্ত থাকুন। পোস্টগুলি অবশ্যই শেয়ার করবেন।
তথ্যসূত্রঃ
(১) Dr. K. K Duta, vide An Advanced history of India, p. 346.
(২) History of Bengal, vol-II, P. 151, jadunath Sarkar.
(৩) স্বদেশ পরিচয়, জীবন মুখোপাধ্যায়।
(৪) বাংলার ইতিহাস, আব্দুল করিম।
(৫) Wikipedia
চলবে ইনশাআল্লাহ....