❒ এবারের আলোচনা পাত্রীপক্ষের অভিভাবকের উদ্দেশ্যেঃ-
একজন মেয়ের অভিভাবক কী চান ? অবশ্যই এমন পাত্রের নিকট মেয়েকে হস্তান্তর করতে যার কাছে মেয়ের ভবিষ্যত ভাল হবে, মেয়ে ভাল থাকবে। কিন্তু ভবিষ্যত বলতে কী বুঝায় ?
মানে, যা আগামীতে আসতে চলেছে, ফিউচার টেন্স । তো আগামীতে সব শেষে কী আসতে চলেছে ? উত্তরে পরে আসি ।
.
অধিকাংশ অভিভাবকেরই এমন চিন্তাধারা , একজন টাকাওয়ালা জামাই হলে মেয়ে ভাল বাসায় থাকবে, আলিশানে থাকবে, বড় গাড়িতে চড়বে, ভাল মানের খাবে, সুন্দর পোষাক পড়বে ইত্যাদি অর্থাৎ মোট কথা মেয়ে সুখী হবে ।
একবার চিন্তা করুন, সেই জামাই যদি পরক্রিয়া করে ? আপনার মেয়েকে মানসিক ও শারীরিক টর্চার করে ?
.
আচ্ছা আমরা পজিটিভ ভাবি।
ধরে নিই, সে সম্পত্তিওয়ালা জামাই আপনার মেয়েকে ভালো রাখল, ভালবাসল, টর্চার করলনা, আলিশানে রাখল, গাড়িতে চড়াল সব ওকে কিন্ত সব থেকে বড় কথা সেই জামাই যদি আপনার মেয়েকে জান্নাতেই এ নিয়ে যেতে না পারে তাহলে কী লাভ ?
অবশ্য লাভ লোকসান এর হিসেব তো সমোঝদার কাছে জান্নাত জাহান্নাম আর মুর্খ বোকাদের কাছে পার্থিব অর্থ সম্পদ দিয়ে বিবেচিত।
.
❒ এবার আগের উত্তরে আসি - সব থেকে ভবিষ্যতে আসতে চলেছে মৃত্যু । তারপর যদি আপনার মেয়ে জান্নাতে থাকে ইন শা আল্লাহ সেটাই তার জন্য সব থেকে সুখের স্থান।
তার থাকা, খাওয়া দাওয়া, পোশাক, সুখ শান্তি ইত্যাদি নিয়ে আপনাদের আর কোন চিন্তা নেই। কারন সে সেখানে স্বয়ং আল্লাহ সুবহানওয়ালা তায়ালার হেফাজতে। অভিভাবক হিসেবে আপনারা তখন স্বার্থক আর আল্লাহ চাইলে নেক সন্তান আপনাদেরও জান্নাত যাবার উছিলা হতে পারে।"
.
অতএব, মেয়ের জন্য পাত্র নির্বাচনে কেবল এবং কেবলমাত্র ছেলের দ্বীনদারিতা ও উত্তম চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। এর সাথে আল্লাহতায়ালা ভাল বংশ, ভাল রিজিক, ভাল সেটেল চাকরিওয়ালা ছেলে মেলালে আলহামদুলিল্লাহ, আর না মেলালেও আলহামদুলিল্লাহ।
যদি ছেলে গরীবও হয় , পরকালে সে অন্যদের থেকে ৫০০ বছর পূর্বে জান্নাতে যাবে আর ইনশাআল্লাহ আপনার মেয়েকেও জান্নাতে নিয়ে যাবে। এই পাচশ বছর দুনিয়ার পাচশ বছর না, বরং এর একেকদিন তো দুনিয়ার একেক বছর, একেক মাস এভাবে সমতূল হবে।সম্পদশালীরা সম্পদের হিসেবের কারণে জান্নাতে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হবে।
.
❒ অভিভাবকদের উদ্দেশ্যেও রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
"তোমাদের ছেলে বা মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে কেউ প্রস্তাব দিলে যদি তার দ্বীন ও চরিত্র তোমাকে মুগ্ধ করে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। শুধু দ্বীন ও চরিত্র দেখে তাদের বিয়ে না দাও বরং দ্বীন বা চরিত্র থাকলেও শুধু বংশ, রূপ বা ধন-সম্পত্তির লোভে বিয়ে দাও) তবে পৃথিবীতে বড় ফিতনা ও মস্ত ফাসাদ, বিঘ্ন সৃষ্টি হবে।"
(ইবনে মাজাহ-১৯৭)
.
একজন দ্বীনদার ছেলে হোক সে দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত, সে আপনার মেয়েকে কখনও কষ্ট দিবেনা কারন সে জানে আপনার মেয়ে তার কাছে আমানত এবং আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতও। তাকে এই নেয়ামতের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে তার রবের কাছে।
একজন দ্বীনদার ছেলে আপনার মেয়ের কাছে ভাল হবার চেষ্টা করবে কারন তাঁর রাসুল (সাঃ) তাকে বলে গিয়েছেন- স্ত্রীর সার্টিফিকিটেই একজন সর্বোত্তম হিসেবে পরিগণিত হবে। সে পরক্রিয়া তো দূরে থাকে, স্বীয় স্ত্রী বাদে অন্য যেকোন মেয়ের দিক থেকে দৃষ্টি নামিয়ে চলবে । সে কেবল আপনার মেয়েকে দেখেই চোখ জুড়াবে।
সে যদি কখনও আপনার মেয়েকে বকাঝকা করে বা কড়া শাসন করে তবুও তা আপনার মেয়ের ভালোর জন্যই করবে । কারন আপনার মেয়েকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়াই উদ্দেশ্য । কথায় আছে – শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে।
.
বলছিনা যে সব টাকাওয়ালা ছেলেরা খারাপ, বা দ্বীনদার মাত্রই গরীব। এটুকুই বলার যে ,মেয়ের বিয়ের পাত্র নির্বাচনে প্রাধান্য দেওয়া উচিত কেবল ছেলের দ্বীনদারিতা আর চরিত্র কে।
আর পাত্র খোজার সময়, সর্বদা প্রতিষ্ঠিত পাত্র খোজার মানসিকতা থেকে সরে আসুন, অনেক ছেলেই আছে যে এখন হয়ত ছাত্র, বয়স কম অথচ তার একটা সুন্দর ভবিষ্যত আছে, প্রতিষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা আছে। সেই ছেলেকেও একবার আল্লাহকে তাওয়াক্কুল করে বিশ্বাস করে দেখুন ।
.
'...অবস্থা ভাল হলে তো সবাই সংগী হবার জন্য লাইন দেয়, কিন্তু যখন কিছুই থাকেনা, তখন যে সঙ্গী হতে প্রস্তুত থাকে বা সঙ্গী হয় –তার প্রতি কৃতজ্ঞতার লেভেল টাই অন্য রকম থাকে।
.
.
তার মানেও এই নয় যে মেয়ে অবৈধ প্রেমের জের ধরে যাকে তাকে বিয়ে করতে চাইবে আর আপনারা সেটা মেনে নিবেন। কখনই না । মেয়ে আপনার দেহ ও আত্মার অংশ, কলিজার টুকরো । মেয়েকে স্বয়ং রাসুল (সাঃ) কোনদিন মা, মামণি ছাড়া সম্বোধন করেন নি। আপনার মেয়েই আপনার জান্নাত যাবার মাধ্যম।
মেয়েকে ভালভাবে মানুষ করে একটা ভাল জায়গায় বিয়ে দেওয়া আপনার জন্য ফরজ করেছেন আল্লাহ। তাই মেয়ে পছন্দ করলেই যার তার কাছে মেয়ে হস্তান্তর করা কাম্য নয়।
কিন্তু আপনার কাছে এই “ভালো” এর সংজ্ঞা যদি কেবল টাকা, বংশমর্যাদা আর শো অফ করা যাবে যেই জামাই কে নিয়ে এমন জামাই প্রেফারেন্স হয় তাহলেই সমস্যা এবং এভাবেই সমাজে ফিতনা ও নৈরাজ্য প্রসার লাভ করে।
.
ইসলামে কোন মেয়ের নিজে থেকে তার বিয়ের কথা অভিভাবককে জানানো কে উতসাহ দেওয়া হয়। আমাদের সমাজে এটাকে বেহায়াপোনা হিসেবে দেখা হয়, অথচ বিয়ের কথা বলার নির্লজ্জ্ব ভঙ্গিটা পাপ না,কিন্তু নির্লজ্জ্ব পথ তৈরি করে দেয়া,ঐ পথে হাটতে দেয়াটা পাপের।
তাই মেয়ে নিজে থেকে কোন পাত্রের সন্ধান দিলে তার প্রস্তাবনা কে সম্মান দিন, অন্তত একবার খোজ নিয়ে দেখুন সে পাত্র সম্পর্কে। সম্পর্কের উপর ইগোকে জিততে দিয়েন না।
❒
হজরত ফাতেমা (রাঃ), নবী দুহিতা, নবীর দেহের অংশ, কলিজার টুকরো। তাঁর উপাধি হল আয্-যাহরা – যার অর্থ হল ‘জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব’ অথবা ‘আলোকিত মহিয়সী নারী’। আল্লাহ এর কাছে শ্রেষ্ঠ ৪ নারীর একজন তিনি। তাকে বিয়ের জন্য অনেক প্রখ্যাত, ধনী সম্পদশালী সাহাবা রা প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
.
কিন্তু রাসুল (সাঃ) বিয়ে দিলেন হজরত আলী (রাঃ) এর সাথে। অথচ আলী (রাঃ) ছিলেন হতদরিদ্র। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাঁর বাসায় চুলো জ্বলত না। তবুল রাসুল (সাঃ) তাঁর প্রিয় কন্যাকে এমন দরিদ্র পরিবারে দিতে একটুও সংকোচ করেন নি, কারন রাসুল (সাঃ) জানতেন, হজরত আলী (রাঃ) এর দ্বীনদারিতা ও চরিত্রের জন্য তাঁর থেকে উত্তম পাত্র আর কেউওই হতে পারে না রাসুল কন্যার জন্য।
.
আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেয় রাসুল (সাঃ) ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন আলী (রাঃ) এর ঘরেই স্বীয় কন্যার ইহলৌকিক ও পরলৌকিক কল্যান রয়েছে।
.
বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত হযরত আলীর কোন বাড়ি-ঘর ছিল না। তিনি রাসূলুলস্নাহ (সঃ)-এর সংসারেই থাকতেন। বিবাহের পর ফাতেমা (রাঃ) কে নিয়ে বাস করার জন্য যখন বাড়ির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল, তখন হারেস বিন নো'মান আনসারী তাদের বাস করার মতো একটি বাড়ি দিলেন। হযরত ফাতেমাকে নিয়ে হযরত আলী সেই বাড়িতে উঠে আসলেন এবং বসবাস করতে লাগলেন।
রাসূল (সাঃ) আলী (আঃ)-এর দিকে তাকিয়ে বললেন-
"এমন কিছু কী আছে যা দ্বারা তোমার স্ত্রীর দেন মোহর প্রদান করবে? ”
আলী (আঃ) বললেন -
" আমার পিতা-মাতা আপনার প্রতি উৎসর্গিত হোক। আপনি আমার জীবন-যাপন সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত আছেন। আমার নিকট একটি তরবারী, একটি ঢাল ও একটি উট ছাড়া আর কিছুই নেই।”
রাসূল (সাঃ) বললেন,
" ঠিক আছে, ইসলামের শত্রট্টদের সাথে যুদ্ধের সময় তোমার তরবারী প্রয়োজন হবে। তাছাড়া উঠটি দিয়ে খেজুর বাগানে পানি দিতে এবং সফরের সময়ও তোমার উঠের প্রয়োজন হবে।
অতএব, অবশিষ্ট থাকে শুধুমাত্র ঢালটি, আর তা দিয়েই তোমার স্ত্রীর দেন মোহর প্রদান করবে। আমি আমার কন্যা ফাতেমাকে কেবলমাত্র উক্ত ঢালের বিনিময়ে তোমার সাথে বিবাহ দিলাম।”
ইতিহাসে এ ঢালটির সর্বোচ্চ যে মূল্যটি উল্লেখ করেছে তা হচ্ছে ৪৮০ দিরহাম।
.
.
আফসোসের বিষয় এখন অনেক অভিভাবক, মেয়ের পাত্র নির্বাচনে ছেলের অর্থ সম্পদ ইত্যাদি পেলে, ছেলের দ্বীনদারিতা না থাকলে বা চরিত্রে একটু ‘ইয়ে’ থাকলেও তা স্যাক্রিফাইস করে অথচ শুধুমাত্র দ্বীনদারিতা থাকলে বাকী সব স্যাক্রিফাইস করা যাবে এমন মানসিকতা থাকা উচিত ছিল। আল্লাহ এর রাসুল থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। রাসুল (সাঃ) তাঁর মেয়েকে কী আপনি আপনার মেয়েকে যেটুকু ভালবাসেন তার থেকে কম ভালবাসতেন ? কতই না উত্তম পিতা ছিলেন তিনি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন -
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيراً
…………..নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আদর্শ তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।’
(সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)
.
দয়া করে বস্তুবাদী চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসুন। দ্বীনদার যে ছেলেরা মানসিক প্রশান্তির জন্য, চরিত্র হিফাযতের জন্য বিয়ে করতে চায় তাদের কাছে নিজের কন্যাকে হস্তান্তর করুন। সমাজের বিরাট উপকার হবে। কবরে নিয়ে যাওয়ার মত পাথেয় হবে।আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন।
Written by: Shah Mohammad Tonmoy
Published by: Ilm Media - ইলম মিডিয়া
........... ............ ..........
❒ পর্ব-৪ (শেষ পর্ব) এর আলোচনায় থাকছে ইনশাআল্লাহ – শরীয়ত মোতাবেক যেসব মেয়ে বিয়ের প্রয়োজন অনুভব করছেন, কিন্তু পরিবার বা অভিভাবকরা সেই ব্যাপারে উদাসী, সেই ক্ষেত্রে একজন মেয়ে কী করতে পারে।