বাগদাদের অতিত ইতিহাস

 

বাগদাদের অতিত ইতিহাস

বাগদাদ, এককালের আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী, শুধু আব্বাসীদের না এককালে এটি পুরো বিশ্বের রাজধানী ছিল। এই শহরের সাথেই জুড়িয়ে আছে মুসলিমদের সোনালী ইতিহাস। এই শহরের প্রতিষ্ঠাতা খলিফা আবু জাফর মানসুর। আব্দুল্লাহ ঈবনুল মুবারক রহ. এ শহরকে বাগদাদ নামে ডাকা পছন্দ করতেন না। তার মতে বাগদাদ শব্দের অর্থ দেবতার দান। তিনি এই শহরকে বলেন মদিনাতুস সালাম, যে নামটি রেখেছিলেন শহরের প্রতিষ্ঠাতা আবু জাফর মানসুর। শুধু আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক নন, ইমাম আসমাঈ রহ. ও এই মত পােষণ করেন। তবে আলেমদের অন্য অংশের মতে বাগদাদ মূলত বাগ ও দাদ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। এর অর্থ দাদ নামক এক ব্যক্তির বাগান। 


বাগদাদ শহরটি প্রতিষ্ঠা করেন দ্বিতীয় আব্বাসি খলিফা আবু জাফর মানসুর। এ শহর প্রতিষ্ঠার আগে তিনি কুফার সীমান্তবর্তী একটি শহর হাশিমিয়্যাতে অবস্থান করতেন। ১৪১ হিজরীতে এই শহরে আবু জাফর মানসুরের উপর একটি হামলা চালানাে হয়, যার ফলে তিনি বাধ্য হন নিজের জন্য নিরাপদ একটি আবাসস্থল খুঁজে নিতে। এই হামলার পেছনের ঘটনাটি বেশ রােমাঞ্চকর। ১৩৬ হিজরীতে আবু জাফর মানসুরের হাতে নিহত হন আবু মুসলিম খােরাসানি। তিনি ছিলেন একজন দুধর্ষ সেনাপতি, আব্বাসিদের উত্থানে যার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তিনি নিহত হন। আবু মুসলিম খােরাসানির হত্যাকাণ্ডের পর সবচেয়ে অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল রাওয়ান্দিয়া ফিরকার লােকেরা। তারা ছিল খােরাসানের বাসিন্দা। আবু মুসলিম তার আন্দোলনে তাদেরকে নিজের সাথে রেখেছিলেন। ফলে তার সাথে এই ফিরকার লােকদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। এই ফিরকার লােকেরা পূনর্জন্মে বিশ্বাস করত। তাদের বিশ্বাস ছিল আদম আ. এর রুহ আবু মুসলিম খােরাসানির মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল। আবু মুসলিমের মৃত্যুর পর তা স্থানান্তরিত হয়েছে উসমান ইবনে রাহিকের মধ্যে। ইনি ছিলেন খলিফার প্রহরীদলের প্রধান। এই ফিরকার লােকদের বিশ্বাস ছিল তাদের খাবার ও পানিয়ের যােগানদাতা হলেন আবু জাফর মানসুর। তিনিই তাদের প্রভু। একদিন তারা দলবদ্ধভাবে হাশিমিয়্যা শহরে এসে খলিফার প্রাসাদের চারপাশে তাওয়াফের ন্যায় ঘুরতে থাকে। এসময় তারা বলছিল, এটি আমাদের রবের প্রাসাদ। খলিফা তখন তাদের দুশাে জনকে বন্দি করেন। এতে তারা মানসুরের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা বলতে থাকে, আপনি কেন আমাদের লােকদের গ্রেফতার করলেন। তারা কারাগারে হামলা করে নিজেদের লােকদের মুক্ত করে। ক্রমেই হট্টগােল ও কোলাহল বাড়তে থাকে। তাদের লােকেরা শহরের ফটক বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলাে, যে খলিফাকে তারা নিজেদের প্রভু বলে বিশ্বাস করতাে, তার উপরই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তাকে হত্যা করার জন্য একে অপরকে উত্তেজিত করতে থাকে। খলিফা তাদের শান্ত করার জন্য প্রাসাদ থেকে বের হয়ে আসেন। এ সময় তিনি ছিলেন অনেকটাই অরক্ষিত। রাওয়ান্দিরা তাকে ঘিরে ফেলে। খলিফার ভাগ্য ভালাে, কোনাে বিপদ হওয়ার আগেই শহরের নিয়মিত সেনাবাহিনী এগিয়ে আসে এবং তারা রাওয়ান্দিদের কচুকাটা করে ফেলে। এরপর আর কখনাে তাদের দেখা যায়নি। কিন্তু এই ঘটনার ফলে খলিফা সিদ্ধান্ত নেন, নিজের জন্য তিনি একটি নিরাপদ শহর নির্মাণ করবেন। খলিফা তার লােকজন নিয়ে কুফা থেকে বের হন। তিনি বিভিন্ন এলাকা সফর করে বর্তমানে যেখানে বাগদাদ শহরের অবস্থান, এই এলাকায় পৌঁছেন। খলিফা লক্ষ্য করলেন এই খালি জায়গাটা নদীর তীরে অবস্থিত। ফলে যেকোনাে অঞ্চল থেকে এখানে সহজে জলপথে জিনিসপত্র আনা নেয়া করা যাবে। খলিফা এখানে কয়েক রাত অবস্থান করলেন তাবু খাটিয়ে। দেখলেন এখানে সবসময় নির্মল মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহিত হয়, ফলে বসবাসের জন্য জায়গাটা বেশ চমৎকার। খলিফার নির্দেশে শুরু হলাে শহরের নির্মাণকাজ। খলিফার আদেশে শহরের মাঝখানে নির্মাণ করা হয় প্রাসাদ। এর পাশে নির্মাণ করা হয় জামে মসজিদ। পরে এটি প্রসিদ্ধ হয় জামে আবু জাফর মানসুর নামে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন